ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রেরণার নাম ম্যাকগিন মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে ফিরে আসার রোমাঞ্চ হাইতির স্বপ্নসারথি ইসিদোর অবসর ভাবনায় কর্তোয়া ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু কানাডার কাতারের সামনে সুইজারল্যান্ড চ্যালেঞ্জ লুকিচের গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে বসনিয়া কানাডার বিশ্বকাপ বরণ অনুষ্ঠান মাতালেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সঞ্জয় ইনজুরিতে বিশ্বকাপ শেষ, ভাঙা হৃদয়ে অবসর ঘোষণা মৃত্যুকে হারিয়ে বিশ্বকাপ হিরো গিমেনেজ আর্জেন্টিনা শিবিরে বড় সুসংবাদ হঠাৎই অবসরে উইলিয়ামসন সিলেটের মাজারে দানের টাকার ‘বেহিসেবী’ ঘোচাতে চান ডিসি সারওয়ার বেলকুচিতে উদ্ভাবননির্ভর দেশ গঠনে বিজ্ঞান মেলা টাঙ্গাইলে এলএসডি ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন চলে গেলেন আধুনিক শিল্পের আইকন ডেভিড হকনি সনকে নিয়ে অস্বস্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি এখন শেষ পর্যায়ে? পাকিস্তানের নতুন দাবি নাটকীয় সমাপ্তিতে ১৬ বছর পর চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান মন্তব্য ঘিরে আইনি জটিলতা, মমতার বিরুদ্ধে মামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ইরান: আরাঘচি সিলেটে ফাহিমা হত্যার ১ মাস পর চার্জশিট দিল পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়, ছয় লেন সড়ক, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন; প্রধানমন্ত্রীর কাছে কক্সবাজারবাসীর যত প্রত্যাশা হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যু ৬৪৩ আক্রান্ত ৮৪২৬৬ স্থায়ী নিয়োগসহ ছয় দফা দাবিতে রাজশাহীতে কর্মচারীদের সমাবেশ সোনারগাঁওয়ে আইফোনসহ ১৪৬ মোবাইল চুরি, প্রায় কোটি টাকা ক্ষতি শাহ আমানত বিমানবন্দরে ৬৪৭ কার্টুন সিগারেট জব্দ প্রথম ম্যাচে খেলা হচ্ছে না ডেভিসের নওগাঁয় দুইদিন মাইকিং করেও মেলেনি ব্রাজিল সমর্থক বর্তমান বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ নেই: নাহিদ ইসলাম
Nagad desktop

নহ মাতা নহ কন্যা

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০১ পিএম
নহ মাতা নহ কন্যা
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

কার্তিকের কুয়াশা যেন আশ্বিনের গোড়াতেই ঘিরে ধরেছে চারদিক। সন্ধ্যা ঘনিয়ে নামতে না নামতেই মিহি বরফকুচির মতো কুয়াশা পড়তে শুরু করে।

 সেই কুয়াশায় ভিজে ভিজে গ্রামের বউ-ঝিয়েরা আসে পূজামণ্ডপে ঠাকুর দেখতে। প্রতিমা দর্শনকে তারা বলে ঠাকুর দেখা। তাদের কৌতূহলের অন্ত নেই। সারা দিনের ঘর গেরস্থালি সামলানোর পর স্নান টান করে বেশ একটা স্নিগ্ধ পবিত্রতা অন্তরে ধারণ করে তারা আসে মণ্ডপে। বাইরের রেলিং ধরে দাঁড়ায়। কী যে দেখতে চায়, আর বাস্তবে কী দেখতে পায়- তার নেই ঠিক-ঠিকানা। বাঁশ-খড়-কাদা মাটিতে প্রতিমার মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর পূজাকমিটির লোকজন পর্দা টেনে দিয়ে যায়। মাথার ওপরে এনার্জি সেভিং বাল্ব আলো ছড়ায় ফকফকা। পর্দার ভেতরে রবি পাল তার সঙ্গী-সাগরেদ নিয়ে কাজ চালিয়ে যায়; আড়াল ঠেলে যেটুকু আলো বাইরে বেরিয়ে আসে তাতে গা-ছমছমে অন্ধকার আরও ভুতুড়ে পরিবেশ রচনা করে কুয়াশার সঙ্গে মিশে। তবু তাদের আসা চাই। কুয়াশার চাদরের আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি দেওয়া চাই। একটুখানি ফাঁকফোকর গলে যদি-বা সামান্যতম দেবী দর্শনও ঘটে যায়, তাতেই জীবন ধন্য। রবি পাল সহসা একদিন এদের মধ্যেই আবিষ্কার করে বসে তার হারানো কন্যা সাবিত্রীকে। ঠিক সেই নাক-মুখের গড়ন, থুঁতনির নিচে কাটা দাগ, চোখ দুটো টানাটানা- চমকে ওঠে রবি পাল। হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে। রেলিঙের দিকে দুই পা এগিয়ে যায় আর ভাবে, এ হতভাগী এখানে এল কেমন করে! এ্যাঁ, ওইটুকুন মেয়ের মাথায় সিঁদুর! না না, সাবিত্রী সিঁদুর কোথায় পাবে! বিয়ের কোনো কথাই নেই, কেশবপুর হাই ইশকুলের ক্লাস নাইনের ছাত্রী; সেখানে থেকে কলেজে যাবে, আইএ, বিএ পাস করবে, তার পর মাথায় সিঁদুর। মাস্টারি করার শখ ছিল তার। কোথায় উড়ে গেল সেসব শখ-স্বপ্ন! গেলবার ভোটের মৌসুমে দুটো বদরাগী মোটরসাইকেল গাঁ গাঁ করে ছুটে এসে হেডলাইটের তীব্র আলোয় প্রথমে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তার পর বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যায় তাকে। কোথায় যায় কতদূরে, অনেক তত্ত্ব তালাশ করেও সে কথা জানা যায়নি। অথচ এতদিন পরে এই এতদূরে প্রতিমা গড়তে এসে সেই সাবিত্রীকে এভাবে হাতের মুঠোয় পাওয়া যাবে- এ কি ভাবা যায়!

রবি পালকে এগিয়ে আসতে দেখে অল্পবয়সী বউটি মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। রবি পাল তখন উদ্ধার করতে সক্ষম হয় সাবিত্রীর চেয়ে এই মেয়েটির গায়ের রং বেশ খানিক চাপা। গ্রামের মানুষ কালোই বলবে। না, না, এ মেয়ে তার সাবিত্রী নয়। এ ব্যাপারে নিঃসংশয় হওয়ার পর সৃষ্টি হয়েছে তার আর এক জ্বালা। সাবিত্রীর অন্তর্ধান সেই কবেকার কথা! সহসা তার মুখ মনেই পড়ে না। অথচ এই ঘোমটা টানা বউটি কেমন করে যেন রবি পালের অন্তরের খুব নিভৃত এক কোণে নিজের জন্য আসন পেতে নেয়। দেবীমূর্তির আদল ফোটাতে গিয়ে ভারি সংকট দেখা দেয়, কালোপনা সেই বউটি এসে তার কাঁধে ভর করে, কিছুতেই নামতে চায় না। রবি পাল তখন কী করে! হাতের কাজ ফেলে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে নিজের হাতে গড়া খড় মাটির মূর্তির দিকে। চোখের পলক পড়ে না। তাকিয়েই থাকে নির্ণিমেষ। দেবীর তখনো চক্ষুদান সম্পন্ন হয়নি। ফলে চোখে চোখে কোনো কথা হয় না। তবু অন্তরে অন্তরে আকুল হয়ে শুধায়,

সত্যিই তুই কৈলাস থেকে নেমে এয়েচিস মা?
দেবী নিরুত্তর। ভেতরে ভেতরে দগ্ধায় রবি পাল। আবার প্রশ্ন করে,
কীসে চড়ে এলি এবার? গজে না রথে?

উত্তর আসে না কিছুই। কিন্তু রবি পালের কানের দরজায় আছড়ে পড়ে সেই কবেকার কালসন্ধ্যায় শোনা দুর্বৃত্ত মোটরবাইকের গোঁয়ার গর্জন। তখনই কানে আঙুল গুঁজে বিভ্রমটা সে শুধরে নেয়- না, সে তো আগমনী ছিল না, ছিল প্রতিমা বিসর্জনের পালা। নৌকায় নয়, দেবী চলে যায় মোটরবাইকে চেপে; ওরা দুজনের মাঝখানে চেপে বসায়, মুখে রুমাল গুঁজে দেয়; তার পর ভটভটানো শব্দ তুলে হাওয়া। রবি পাল অস্ফুটে বিড়বিড় করে- সেই তোর যাওয়া, আর এই এ্যাদ্দিন পরে এলি মা?

সেবার সেই অঘটনের পর বছর দুই-তিন প্রতিমা গড়ার কাজে মনোযোগই দিতে পারেনি রবি পাল। বর্ষা গিয়ে শরতের কাশফুল পাখনা মেলতে না মেলতেই বিভিন্ন জায়গা থেকে কাজের বায়না আসে। না বললে তো চলে না। বাপ-ঠাকুর্দার আমল থেকে বেশ কয়েক গ্রামের পূজামণ্ডপে তাদের বাঁধা-কাজ; ফেরাবে কী করে? কৃষ্ণনগরের মালাকারদের যে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি, তাদের সঙ্গে টেক্কা দিয়েছে সত্য পাল। একমাত্র ছেলে নিত্য পালকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছে। নিত্য একবার বর্ডার টপকে ইন্ডিয়ায় গিয়ে দেখে আসে বিভিন্ন রকম ঠাকুর! রবি তখন সবে কৈশোরে! নিত্য পাল পরম আগ্রহে কিশোর পুত্রকে শোনায় তার অভিজ্ঞতার বিবরণ, কাদামাটি তৈরি থেকে খড়, বাঁশ বাঁধাছাদা সবই শেখে রবি পাল পরম নিষ্ঠার সঙ্গে। অল্পবয়সেই তার হাতযশ ছড়িয়ে পড়ে। ভারী নামডাক। নিত্য পাল গর্ব করে বলে- আমার খোকার হাতে প্রাণ পায় প্রতিমা, মূর্ত হয়ে ওঠে।

বাবার এসব ভারি কথা কানে যায় ঠিকই, সবটুকু বুঝতে পারে না রবি। বাবার কাছে জানতে চায়, মূর্ত হওয়া মানে কী বাবা?
নিত্য পাল এক গাল হাসি ছড়িয়ে বলে,

মূর্ত মানে প্রকাশ। এই যেমন তোমার মাঝে মূর্ত আমি, আমার আর মরতে দ্বিধা নেই। নিত্য পালের স্বভাবটাই ওই রকম। পেটে খানিক বিদ্যে থাকায় যখন তখন ভারি ভারি কথা উগরে ওঠে। নিজের দোষে লেখাপড়া হয়নি রবি পালের। এ জন্য সে ভয়ানক দীনতা বোধ করে। শেষপর্যন্ত নিজের মেয়ে সাবিত্রীকে ইশকুলে পাঠিয়ে সে দীনতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছে রবি। কিন্তু সেই সাধই বা পূর্ণ হলো কই! মা-ঊমা চলে গেল কৈলাসধামে। তখন কী করে রবি পাল?

এদিকে রবি পালের শিষ্য অনন্তের ধৈর্যচূতি ঘটে। দীর্ঘক্ষণ গুরুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবান্তর ধরতে পারে না। বেশ কদিন থেকেই দেখছে এই আনমনা ভাব। এখন হলো কাজের সময়, এখান থেকে যেতে হবে আর এক জায়গায়, সেখানেও তাড়া আছে, এ সময় আনমনা হলে চলে! মিহি করে মাখানো কাদার লেই হাত থেকে নামিয়ে রেখে কাছে এগিয়ে এসে সে জিজ্ঞেস করে- আজও কি কাজ...।

খপ করে মুখের কথা কেড়ে নেয় রবি পাল, এতক্ষণ পর যেন দম নেওয়ার ফুরসত পায়, হ্যাঁ হ্যাঁ, আজও বন্ধ থাক।
সময় কিন্তু ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনন্ত খুঁচিয়ে দেয়- কত তারিখ গেল মনে আছে তো!
বেদি থেকে নেমে এসে রবি পাল বলে,
আরে যা যা! রবি পাল হাত লাগালে ক দিন?

তা বটে, মন খোলাসা থাকলে সে দুহাতে একাই পারে দশ হাতের কাজ গোটাতে। সে কথা সবাই জানে। তার প্রবল বিশ্বাস, এ হচ্ছে দশভূজা দুর্গারই আশীর্বাদ। কাজে মন বসালে মা দুর্গা তখন করিয়ে নেয়। এ জায়গায় এসে রবি পাল অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করে। গভীরভাবে বিশ্বাস করে এ সময়ে নির্ঘাৎ তার গর্ভধারিণী মা স্বর্গ থেকে নেমে আসে, খুব নিভৃত তার বুকের কবাট হাট করে খুলে নিশ্চিন্তে আশ্রয় নেয় এবং তাকে শত সহস্রবার প্ররোচিত করে- খোকা তুই হাত চালা দেখি, আমি তো আছি!

রবি পাল দ্রুত হাত চালায়। খড়, বাঁশ, পাট, সুতলি বাঁধে, কাদা-মাটি লাগিয়ে ভরাট করে। রাত জেগে জেগে নিপুণ হাতে চিকন মসৃণ কাজ করে। রং তুলিতে মন-প্রাণ ঢেলে দেয়। খুব ছোটবেলা থেকেই তো সে দেখছে তার মা জননী একা হাতে কেমন করে ঘরসংসার গুছিয়ে আলো করে রাখে! দশভূজা না হলে তাই কিছুতে সম্ভব! প্রতিমার গায়ে পোশাক-পরিচ্ছদ, গয়নাগাটি পরানো সারা হলে দিব্যি সেই দশভূজা জননী। চোখের কোণে সন্তানের জন্য অবাধ প্রশ্রয়। তখন রবি পাল নির্মোহ এবং নির্লিপ্ত শিল্পীর মতো আর নির্বাক বসে থাকতে পারে না। প্রতিমার চোখে চোখ রেখে স্ফুট কণ্ঠে ডেকে ওঠে- মা! মায়াময়ী মা আমার! রাতের বৃন্ত থেকে ফুটে ওঠে ভোরের কুসুম। পাখিদের কলকাকলিতে জেগে ওঠে পৃথিবী। রবি পাল আকুল হয়ে ওঠে- মা ধরণী, এই যে এখানে আমি তোর অধম সন্তান। অকৃতি অধম।

স্থানীয় খবরের কাগজের শারদীয় সংখ্যায় একবার রবি পালের শিল্প-সংসার নিয়ে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। সেখানে লেখা হয় ‘রবি পালের হাতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে প্রতিমা।’ এই ‘বাঙ্ময়’ শব্দটি নিয়ে সে পড়ে মহা আতান্তরে। কী অর্থ এই শব্দের? কাকে শুধাবে?

তার খুব মনে হয়, বাবা বেঁচে থাকলে নিশ্চয় এক গাল হাসি ছড়িয়ে অনায়াসে বুঝিয়ে দিত এ শব্দের মানে। প্রতিবেদক লিখেছে বেশ- রবি পালের ঐকান্তিক ইচ্ছে একটি মাতৃমূর্তি গড়ার। দুর্গা প্রতিমা গড়তে গিয়ে তিনি নিমগ্ন চোখে মাকে দেখেন। তাঁর ইচ্ছে- গর্ভধারিণী মায়ের মূর্তিটি এমনভাবে গড়বেন যেন সেদিকে তাকালেই দুর্গা প্রতিমাকে দেখা যায়, যেন এই বাংলাদেশকে অনুভব করা যায়। রবি পাল অবাক হয়- এসব কথাও লিখতে হয় কাগজে!

না, সেই মেয়েটিকে আর কোনোদিন দেখতে পায়নি রবি পাল। প্রথম দেখায় সাবিত্রীর চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যের দিকগুলো যেমন এক ঝটকায় এসে তার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করেছিল, তার পর দিনে দিনে ঘোর কেটে যায়; দর্শনার্থীদের ভিড়ে তাকে খুঁজে না পেয়ে সে দুই চেহারার মধ্যে বৈসাদৃশ্যগুলো আবিষ্কারে তৎপর হয় সেই তেমন করেই। কিন্তু কোথায় সাবিত্রী! বৈসাদৃশ্যই বড় হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। তবু সেই ঘোমটা টানা অল্পবয়সী বউটিকে অন্ততপক্ষে আর একবার দেখার খুবই ইচ্ছে জাগে। নাকে নোলক, মাথায় ঘোমটা, পরনে ডোরা শাড়ি সেই মেয়েটির কোনো পরিচয় তো তার জানা নেই, কাকে কী শুধাবে? হাতের কাজ ফেলে অনন্তের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে সে প্রতিদিনই একাধিকবার এসে খোঁজ নিয়ে যায়- সে কি এল?
না, সে আর আসে না।

সে যে সাবিত্রী নয় এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পরও রবি পাল তাহলে কাকে খোঁজে? কেন খোঁজে? কাজের অবকাশে এ প্রশ্ন সে নিজের কাছেই উত্থাপন করেছে। সত্যিই তো সে কাকে খোঁজে? বুকের মধ্যে কীসের এত হাহাকার গুমরে ওঠে? কীসের এত শূন্যতা? প্রতিদিন পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এসে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী মানুষগুলোর ভক্তিনম্র দৃষ্টির আয়নায় এতদিন পরে কী খোঁজে সে? কাকে খোঁজে? এমন তো ছিল না আগে! তবে কি ঘোমটাপরা অল্পবয়সী গ্রাম্যবধূটি অলক্ষ্যে কোথাও সর্বনাশের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে! আর দৃশ্যমানতার আড়াল থেকে সে বুঝি মজা দেখছে!

আবার একদিন দর্শনার্থীদের ভিড়ে এক মাতৃমূর্তিতে দৃষ্টি আটকে যায় রবি পালের। হ্যাঁ, মাতৃমূর্তিই তো! অল্পবয়সী এক যুবতী-মাতা কেমন অবলীলায় তার জামার বোতাম খুলে দুগ্ধভারাবনত স্তনবৃন্ত গুঁজে দিচ্ছে অবুঝ সন্তানের মুখে। আর বাচ্চাটিও কেমন পাজি নচ্ছার, ডান হাতটা বাড়িয়ে সন্ধান করছে মায়ের বুকের অপর বৃন্তটি। হয়তোবা প্রথম পোয়াতি মা, তবু তার চোখে-মুখে এতটুকু দ্বিধা নেই, শরম নেই। রবি পাল নিজেই সরে আসে সামনে থেকে। পর্দার আড়ালে সরিয়ে আনে নিজেকে। আর তখনই দৃষ্টিজুড়ে নেমে আসে সাবিত্রীর মায়ের স্মৃতি। আকাশভাঙা লজ্জা ছিল তার চোখে।

প্রথম সন্তান কন্যা হওয়ায় কত না কুণ্ঠিত সে! যেন-বা সমস্ত দায় তার। বুকের উষ্ণতায় লুকিয়ে রাখে কন্যাকে। একা একাই আদুরে গীত গায়- ও আমার সতী সাবিত্রীরে! তোকে কোথায় রাখি! এভাবেই নামকরণ ঘটে সাবিত্রীর। তার মা সদাসন্ত্রস্ত, মেয়েকে সর্বদা লুকিয়ে রাখে বুকের মধ্যে। শাড়ির আঁচলের আড়াল তৈরি করে শৈল্পিক কায়দায়। তার পর শিল্পিত সেই ছায়াতেই সাবিত্রীর কচিমুখে তুলে দেয় স্তনবৃন্ত। একদিন কী এক অসাবধানতায় তার বুকের শৈল্পিক পর্দা খসে পড়তেই রবি পালের দুই চোখ ভরে যায় কানায় কানায় মাতৃত্বের ছবির উদ্ভাসে। এসব সেই কবেকার কথা! চোখের পর্দা থেকে এখনো মোছেনি সেই দৃশ্য। রবি পাল কি তাহলে এতদিন পরে পুরোনো সেই ছবি খুঁজে ফিরছে? সাবিত্রীর অন্তর্ধানের মাত্র মাসখানেকের মাথায় সর্পদংশনে বিদায় নেয় তার মা। কে জানে এতদিনে সে তার সতী সাবিত্রীকে খুঁজে পেয়েছে কি না। না হোক দুগ্ধপোষ্য শিশু, তবু সাবিত্রীকে দেখে মাতৃবক্ষের দুগ্ধভাণ্ডার উথলে উঠতেও তো পারে! অসময়ে জোয়ার আসতে কি পারে না?

রবি পাল পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে প্রতিমার কাছে। ষষ্ঠী এসে গেছে, বোধনের আর বিশেষ বিলম্ব নেই। পর্দা উঠে যাবে। দেবী উন্মোচিত হবে সর্বসমক্ষে। তার আগে আপন সৃষ্টির সামনে এসে কুণ্ঠাহীন দৃঢ়তায় দাঁড়ায় রবি পাল। দেবী প্রতিমার মাথার চেলি থেকে পায়ের আলতা পর্যন্ত ঘোর লাগা চোখে পর্যবেক্ষণ করে। পর্দা উন্মোচনের আগে শেষ বারের মতো চোখ বুলিয়ে নেওয়া, কোথাও কোনো সংশোধনী যদি লাগে! কোথাও! কোথাও! রবি পালের দৃষ্টি এসে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রতিমার সুউন্নত বক্ষদেশের উপত্যকায়। কী চমৎকার সুডৌল গড়ন! যেন-বা স্বর্গ থেকে গড়িয়ে পড়া দুটি বাতাবি লেবু এইখানে এসে স্থির হয়েছে। এইখানে? রবি পাল তাকিয়ে দেখতে পায়, তার ডান হাত এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে প্রতিমা বক্ষের উপত্যকায়। কিন্তু এ কী উত্তাপ তার হাতের তালুতে! আশ্চর্য! অতি দ্রুত সে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। চমকে ওঠে রবি পাল। চোখ রগড়ে ভালো করে তাকায়- কে দাঁড়িয়ে তার সামনে দেবী দুর্গা, নাকি সাবিত্রীর মা? স্বচ্ছ আলো ঠিকরে পড়ছে চোখে মুখে, তবু কেন যে এই অধ্যাস! কেন এ বিভ্রম, কে বলবে?

প্রতিমা বক্ষ থেকে নিজের ডানহাত ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে টেনে নেয় রবি পাল। নিজেকেই সে ধিক্কার দিয়ে ওঠে- এসব কী হচ্ছে? কী মানে হয় এসব কাণ্ডকীর্তির? সহসা রাগ চড়ে যায় মাথায়। সেই রাগ ঝাড়ে অনন্তের উপরে,
হা করে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস, এ্যাঁ?
অনন্ত কোনো রকমে উত্তর করে,
আপনার হাতের কাজ দেখছি কর্তা!

হাতের কাজ!
রবি পাল নিজের ডান হাতের দিকে একবার তাকায়। তার পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে অনন্তকে আদেশ দেয়,
এক তাল কাদা নিয়ে আয় দেখি!

কাদা! সব কাজ গুটানোর পর আবার কাদা কী হবে?
বকবক করিসনে তো! যা বলছি তাই কর। কাদা আন।
রংচং হয়ে গেছে। এখন কাদা কোথায় লাগবে?
তুই কাদা আন। আমি অসুরের গায়ে কাদা দেব। মুখে কাদা দেব।


রফিকুর রশীদ

কবিতা হেলিওস

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
হেলিওস

একটা অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

          অর্ধবৃত্তের মতো অবকাশ রচনা করেছি

 

আছে মা-পাখির ডিম ভেঙে যাবার প্রতিকল্পে

            সর্বজনীন বেদনা

বৃদ্ধ বাবার ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর এক বুকচাপা

            দীর্ঘশ্বাসের সীমিত চতুর্ভুজ

রানা প্লাজাসদৃশ ব্যথিত পাণ্ডুলিপি

তরতাজা যুবকের গুম হওয়ার ন্যায়

                   একটা দীর্ঘ সকাল

আছে মায়ের জেগে থাকা চোখ

আছে একজোড়া

            সুসিদ্ধ ইকোলজি

আছে বোনের ব্যবহৃত কাঁকড়া ক্লিপের উদার সৌন্দর্য

আছে একটা গামছায় হাত মোছার দুটো অবিকল সবাক ছবি

 

এই তো আমার রূপকল্পের ইতিবৃত্ত

 

 এখন কোনো অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

            আমি পূর্ণবয়স্ক অবকাশ রচনা করব

জীবনের সব হুলস্থূল এনে ভরে রেখে দেব

 

 দ্যাখো, হেলিওসের মতোনই তোমাদের কাছে যাব আমি

 

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

গহিন অতলের অবাধ চত্বরে বৈভবে থাকে

তাকে কি টুকরো টুকরো করা যায়

অবয়বে বেড়ে ওঠে না কস্মিনকালে

এক টুকরোই থেকে যায় আদিঅন্ত কাল

ভূমিদস্যুরা তবু ওই জলা দখলে মত্ত হয়

বেপরোয়া ছুরি-কাঁচির নির্মমতায়

ঝরনার উৎস স্তব্ধ করে

ফালি ফালি করা অবয়ব থেকে বেরোয়

অজস্র শোণিত ধারা

নদী পর্যন্ত যেতে পারে না শুকিয়ে জ্বলে

ভেসে ভেসে বেড়ায় নিশ্চিহ্ন কাঠামো

নিক্ষিপ্ত হয় মর্তের ঝড়ে

মর্গের ব্যবচ্ছেদে খুঁজে পায় না শিশু আত্মা

পায় শুধু

ছোট্ট এক টুকরো জীবনের অবিকাশ! অবিকাশ!

কবিতা অধরা ও কবি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
অধরা ও কবি

অধরা

সময়ের বেড়াজালে বন্দি খাঁচায়

দূর পানে চেয়ে থাকি তোমার আশায়

উজান সময় স্রোতে এই অবেলায়

তুমি আসবে তো? ভালোবাসবে তো?

 

কবি

কী আছে তোমার? অর্থ, বিত্ত, বৈভব?

প্রভাব, প্রতিপত্তি? বলো, চুপ থেকো না

, এসব তোমার নেই! এবার, তুমিই বলো

আমি কেমন করে তোমার কবিতা হই?

কেমন করে তোমার কাছে আসি

কেমন করে তোমায় ভালোবাসি?

কবিতা প‌রিণ‌তি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম
প‌রিণ‌তি

কালো চিমনিরধোঁয়ায় আকাশের বুকজুড়ে মে কালোমেঘ

মৃত পাখির বাসা সে ড়ে রক্তাক্ত নে

্যামল বাগানগুলো ড়ে আছে যুদ্ধাহত ক্ষতবিক্ষত সৈনিকের তো

জ্বলন্ত কয়লার পাহাড়,

জাগিয়ে তোলে মাটির গহ্বরে ঘুমিয়ে থাকা আগুনকে

প্লাস্টিকের সমুদ্দুর,

ক্ষুধার্ত দৈত্যের তো গিলে খাচ্ছে পৃথিবীকে

যুদ্ধের দামামা পোড়ামাটির ্যস বাড়াতে থাকে শুধু

বোমার ব্দে রে পড়ে পাখির পালক,

আকাশের নীল রং

ভাঙা কাচ য়ে আছড়ে ড়ে মিনে

পৃথিবীর কপালে আগুনের থার্মোমিটার

কামারের হাতুড়ির তো আছড়ে ড়ে উন্মত্ত রোদ

জ্বরে পোড়া পৃথিবীর গা থেকে ঝরতে থাকে বরফ অবিরাম

বৃদ্ধের শুভ্র দাড়ির তন

 

ক্ষুধার্ত সমুদ্র গিলে খায়,

মানুষের স্বপ্নে বোনাউঠোন

তৃষ্ণার কঙ্কা মিনে আঁকে ছড়ানো মানচিত্র

নদীর তীর ক্ষুধার্ত ষাঁড়ের তো গ্রামে ঢুকে ড়ে পাখির কিচিরমিচির বাজেয়াপ্ত হয় কোনো এক ভোরে,

বাড়তে থাকে ছিন্নমূল মানুষের ভেলা,

পৃথিবীর জ্বর নামানোর দাওয়াই খুঁজতে,

লি থেকে মাথাগুলো জড়ো হয় জাতিসংঘের টেবিলে

কথার খই ফোটে, বে চোখ বাঁধা থাকে কালো ফিতায়

 

কবিতা বলির আগে

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
বলির আগে

আমার কথার পরে যদি কোনোদিন

ব্যথা পেয়ে থাকো

যদি এই দুর্দিনে সমূহ বিপদে মনে করো

ডাক দিও কোনো এক নির্মম সকালে

 

আমার বুকেরপরে দূর্বা যেমন থাকে

বেদনায় নীলপদপিষ্ট হলুদ সোহাগে

একবার চোখের জলে ধুয়ে নিও

সকল কলুষতাযেভাবে ধর্ম ছাগ

বলির আগে মুছে ফেলে যত ক্লেদ