সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সমন্বিত নানা আঙ্গিকের মধ্যে দর্শন, সংগীত, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, চিত্রকলা ইত্যাদি একে অন্যের সঙ্গে এত গভীরভাবে অন্তঃপ্রবিষ্ট যে, কোনোটাকেই সহজে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এগুলোর উৎস স্বজ্ঞা বা প্রজ্ঞা বা দুয়ের মিশ্রণ, তবে অভিব্যক্তির মাধ্যম আলাদা। যেমন বোধ ও ধ্যান (দর্শন), ধ্বনি ও সুর (সংগীত), সাহিত্য (কল্পনা ও ভাষারূপ), তথ্য ব্যবস্থাপনা (সাংবাদিকতা), রং বা বস্তু- উপকরণ নির্ভর (চিত্রকলা) ইত্যাদি।
এদের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে সাহিত্য ও সাংবাদিকতা। এ কারণে সর্বকালে সমর্পিত সৃষ্টিশীল ব্যক্তিদের মধ্যে সাহিত্য, সংগীত ও সাংবাদিকতার সমন্বিত নেশা ও পেশা গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্যযোগ্য। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যে এই নিরিখেও সর্বাগ্রগণ্যদের মধ্যে অন্যতম বাঙালির জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম মহাযুদ্ধে সৈনিকের চাকরি শেষে করাচি থেকে ফিরেই তিনি বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে পেশা ও ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন সাহিত্য, সংগীত ও সাংবাদিকতা। প্রথম দুটি মূলত নেশা হলেও সাংবাদিকতাই ছিল তার স্বাধীন পেশা।
অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ তার সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা। তার পরেই আছে সাপ্তাহিক ‘লাঙল’। প্রথম প্রকাশ ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫। লাঙল কাঁধে চাষির ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ। মোট ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয় এই সাপ্তাহিকীর।
দ্বিতীয় সংখ্যায় সংবাদ-গদ্য ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছিল নজরুলের কবিতা ‘কৃষাণের গান’। এটি ২৬ পঙ্ক্তির কবিতা। এ কবিতায় আছে ধ্বনি, ছন্দ, চিত্র, পুরাণ, ব্যক্তিসত্তা, সমষ্টিসত্তাসহ সর্বস্তরের মানবমুক্তির কাব্যিক ও সাংগীতিক অভিব্যক্তি, যার তুলনা বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। মাটিবর্তী মানুষের নাম কৃষক, আর তার জীবনযাপনের ক্ষেত্রে মুখ্য অবলম্বন সভ্যতার আদি নিদর্শন লাঙল। নগর কলকাতা থেকে প্রকাশিত এ পত্রিকার অফিসের সামনে তিনি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন একটা আস্ত ‘লাঙল’। আর এই লাঙলের বন্দনায় লিখেছিলেন এই সুদীর্ঘ বৈশ্বিক কবিতা। তার শুরুর পঙ্ক্তিগুলো এ রকম, ‘ওঠ রে চাষী জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল!/ আমরা মরতে আছি – ভালো করোই মরব এবার চল।’
সেই সুদূর অতীত থেকে চাষির চাষাবাদজাত ফসলের কারণে প্রকৃতিনির্ভর সমাজে যে অবিমিশ্র শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজমান ছিল, এ কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে তার প্রমাণ আছে, ‘উঠান-ভরা শস্য ছিল হাস্য-ভরা দেশ।’ শস্য আর হাস্য লোকসমাজের সচ্ছলতা ও মানসিক শান্তির দ্যোতক। তারপর সভ্যতার বিবর্তন, ধনিকবণিকের মজুতপনা ও দস্যুবৃত্তি বা শোষণ, মানুষে মানুষে অসাম্য, উৎপাদন ও বণ্টনে ভারসাম্যহীনতা থেকে শোষক ও শোষিতের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ ইত্যাদির শব্দচিত্র এঁকে মানবজাতির মুক্তিপথ কোন পথে আসতে পারে তারও আভাস দিয়েছেন কবিতার উপসংহারে, “ঐ বিশ্বজয়ী দস্যুরাজার ‘হয়’-কে করব ‘নয়’/ ওরে দেখবে এবার সভ্যজগৎ চাষার কত বল। শোষক সমাজের ‘হয়’ মানে শোষণ আর ‘নয়’ মানে শোষণমুক্তি।”
কী আশ্চর্য! তার সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা ‘ধূমকেতু’তে তিনিই এই উপমহাদেশের নিঃশর্ত স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, আর দ্বিতীয় পত্রিকায় এসে ঘোষণা করলেন বিশ্বব্যাপী শোষণমুক্তি ও সুষম মানবিক স্বাধীনতার কথা। এ থেকে অনুমিত হয় নজরুল দ্বন্দ্ববাদী দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে কেমন সমাজ চেয়েছিলেন। আসলে তার আরাধ্য ছিল বৈষম্যহীন আর ন্যায়-সুন্দর এক সর্বমানবিক বিশ্বমানবসমাজ অর্জন। তার প্রক্রিয়া হলো গণতন্ত্র ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। এভাবেই তিনি সর্বমানবের জন্য ‘অভেদসুন্দর’ সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে অঙ্গীকৃত ছিলেন।
১৯২৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ঠিক ১০০ বছর অতিবাহিত হলো। অথচ কবি নজরুলের এ ব্যক্তিক, সামষ্টিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক তথা সর্বমানবিক লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে? উত্তর যেহেতু আমাদের সবার জানা, সেহেতু সাফল্য বা বৈফল্যও বিশ্বমানবের সামষ্টিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই নজরুলের এই বাণী আজ শুধু কোনো ব্যক্তির বাণী নয়, বরং গণমানুষের গণবাণী। সত্য যে, নজরুল ‘লাঙল’-এর পর যে পত্রিকা বের করেছিলেন তার নামও ‘গণবাণী’। সে প্রসঙ্গ অন্যত্র আলোচনা করা যাবে। তবে নজরুলের মনোরাজ্যে বোধ, বিশ্বাস ও কর্মপন্থার এই ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
নজরুল এ পত্রিকার প্রধান পরিচালক ছিলেন। সরকারি ডিক্লারেশন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পত্রিকা ছাপা হতো। পত্রিকার হকাররা পত্রিকার জন্য অফিসের সামনে লাইন ধরে দাঁড়াত। বিক্রিও ছিল অবিশ্বাস্য। তখন কেউ ৫ হাজার কপি সাপ্তাহিক পত্রিকার ছাপার কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু ‘লাঙল’ তা-ই ছাপা হতো। তার সঙ্গে ছিলেন তার সম-আদর্শের একদল ত্যাগী সাংবাদিক-সাহিত্যিক। তাদের মধ্যে শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় (সম্পাদক), মুজফফর আহমদ, কুতুবুদ্দিন আহমদ, হেমন্তকুমার সরকার, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রজিৎ শর্মা, দেবব্রত বসু, হৃষিকেশ সেন, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শামসুদ্দীন হোসায়েন, ডা. নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তসহ আরও অনেকে উল্লেখযোগ্য। তারা সবাই পত্রিকার সঙ্গে কাজ করাটাকে পেশা, নেশা ও ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
পত্রিকার মলাট-পৃষ্ঠায় ‘লাঙল’ শিরোনামের নিচে প্রথমে লেখা ছিল ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের মুখপাত্র’।
তার পর নিচে চণ্ডীদাসের বাণী, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় নজরুলের কবিতা (বিশেষত ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছ, গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসের অনুবাদের ধারাবাহিক কিস্তি, কার্ল মার্ক্সের জীবনী, প্রজাস্বত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা, গণ-আন্দোলন সম্পর্কিত পুস্তকের আলোচনা, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সাপ্তাহিক সংবাদ, মতামত ইত্যাদি প্রকাশিত হতো।
‘লাঙল’ পত্রিকার জন্য কবিগুরুর আশীর্বাণী নিয়ে এসেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বকবি লিখেছিলেন, ‘জাগো জাগো বলরাম/ ধরো তব মরু ভাঙা হল/ প্রাণ দাও, মক্তি দাও, স্তব্ধ করো /ব্যর্থ কোলাহল।’ তার আশীর্বাণী শেষ তিন সংখ্যায় (১৩শ, ১৪শ ও ১৫শ) সংখ্যায় মুদ্রিত হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলার সারস্বত ও প্রগতিশীল সম্প্রদায়কে নিয়ে সমন্বিত যাত্রা শুরু করেছিল এই ব্যতিক্রমী ‘লাঙল’। সর্বশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় রোজ বৃহস্পতিবার, ২ বৈশাখ ১৩৩৩ (ইং ১৫ এপ্রিল ১৯২৬); পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০। তবে অন্যান্য সংখ্যার পৃষ্ঠা ছিল ১৬। স্বল্পজীবী এই পত্রিকা পরে ‘গণবাণী’ নামে প্রকাশিত হতে থাকে।
আমরা প্রথম সংখ্যায় নজরুলের ‘লাঙল’ শীর্ষক নজরুলের নাতিদীর্ঘ সম্পাদকীয় থেকে নির্বাচিত অংশ এখানে উদ্ধার করছি। “যেখানে দিনদুপুরে ফেরিওয়ালা মাথায় করে মাটি বিক্রি করে, সেই আজব শহর কলকাতায় ‘লাঙল’ চালাবার দুঃসাহস যারা করে, তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন। কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা ‘লাঙল’ নিয়ে বেরুলাম। … পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রয়োজনে শহরের সৃষ্টি হয়ে পল্লীভূমি বাংলার সভ্যতা সাধনা লোপ পেতে বসেছে। শাসন এবং শোষণের সহায়তায় যন্ত্র স্বরূপে আত্মবিক্রয় করে শহরে উঠে এসেছেন। গ্রামের আনন্দ-উৎসব রোগ-শোকের চাপে লুপ্ত হয়ে গেছে। শহরের বেকার বাঙালি আজ বুঝছে গ্রাম ছেড়ে এসে আজ তার কি নিরুপায় অবস্থা হয়েছে। … জমিতে স্বত্ব নেই। যত্নের অভাবে ভূমির উৎপাদিকা শক্তি নষ্ট হয়েছে। উৎপন্নে প্রজার লাভের পূর্ণ অংশ নেই। … আবার বলছি, স্বরাজ পেলে এই আপনিই দূর হবে। … ব্রাহ্মণ পাদরির রাজত্ব গিয়াছে। গুরু-পুরোহিত, খলিফা, পোপ নির্বংশ প্রায়। ক্ষাত্র সম্রাট ও সাম্রাজ্য সব ধসে পড়েছে। রাজা আছেন নামমাত্র।
আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে এখন বৈশ্যের রাজত্ব। এবার শূদ্রের পালা। এখন সমাজের প্রয়োজনে শূদ্র নয়, শূদ্রের প্রয়োজনে সমাজ চলবে। হিন্দু মুসলমান সমস্যা, ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণ সমস্যা- সব লাঙলের ফালের মুখে লোপ পাবে। তাই আমরা লাঙলের জয়গান করলাম। লাঙল নবযুগের নবদেবতা। জয় লাঙলের জয়, জয় নবযুগের দেবতার জয়।” (লাঙল, প্রথম খণ্ড, বিশেষ সংখ্যা, ১ পৌষ ১৩৩২)।
যাদের নৈয়ায়িক ও প্রাকৃতিক শক্তি, সেই কৃষক-শ্রমিক তথা গণমানুষের শক্তি শ্রেণিভেদহীন সাম্যবাদী গণশক্তির প্রতীক। তারাই গড়বে প্রকৃত মানবসমাজ যেখানে ব্যক্তি ও সমষ্টি উৎপাদনের ফল সমবণ্টনের অধিকার পাবে। আসলে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র তথা সাম্যবাদে অঙ্গীকৃত এই বলয় নজরুলেরও উদ্দিষ্ট বলয়। তাই মানবমুক্তির লক্ষ্যে ‘লাঙল’ নামক এ মাটিবর্তী ও প্রতীকী মানবাস্ত্র সর্বকালে মানবজাতির জন্য সব সময় নৈয়ায়িক ও প্রাসঙ্গিক। লাঙল অক্ষয় হোক।