শুনহ মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।
লাঙল পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার শুরুতেই মুদ্রিত হতো চণ্ডীদাসের এই অমর বাণী। শতবর্ষ আগে মানবতার জয়গান গেয়েই লাঙলের পথচলা শুরু হয়। শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের সাপ্তাহিক মুখপত্র রূপে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। পত্রিকার প্রধান পরিচালক ছিলেন মানবতাবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সম্পাদক, মুদ্রাকার ও প্রকাশক হিসেবে নাম ছাপা হতো করাচি সেনানিবাসে নজরুলের ফৌজি বন্ধু শ্রী মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের। ১৫ নম্বর নয়ানচাঁদ দত্ত স্ট্রিট- মেটকাফ প্রেসে মুদ্রিত এবং ৩৭ নম্বর হ্যারিসন রোড থেকে প্রকাশিত হতো ‘লাঙল’।
প্রতি সংখ্যার মূল্য এক আনা, বার্ষিক তিন টাকা। ১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর ‘কালিকলম’ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মুরলীধর বসুকে নজরুল চিঠিতে লেখেন- “...‘লাঙলে’র ফাল আমার হাতে- লাঙলের শুধু বা কাঠেরটাই বেরোয় প্রথমবার।...অফিসের দ্বারে একটা আস্ত লাঙল টাঙিয়ে দিতে বলেছি। ঐ হবে সাইনবোর্ড। বেশ হবে, না?”
১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১ পৌষ, বুধবার (১৬ ডিসেম্বর, ১৯২৫) লাঙলের প্রথম খণ্ড বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়- “যেখানে দিন দুপুরে ফেরিওয়ালী মাথায় ক’রে মাটি বিক্রি করে, সেই আজব শহর কলিকাতায় ‘লাঙল’ চালাবার দুঃসাহস যারা করে, তাদের সকলেই নিশ্চিত পাগল মনে করছেন। কিন্তু এই পাষাণ শহরেই আমরা ‘লাঙল’ নিয়ে বেরুলাম। এই পাষাণের বুক চিরে আমরা সোনা ফলাতে চাই।”
লাঙলে কী কী থাকবে সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার জন্য প্রথম সংখ্যাতে ছাপা হয়-
১. বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের কবিতা
২. ম্যাক্সিম গোর্কির জগদ্বিখ্যাত রোমাঞ্চকর উপন্যাস ‘মা’-এর ধারাবাহিক অনুবাদ
৩. কাল মার্কসের জীবনী
৪. প্রজাস্বত্ব আইনের ধারাবাহিক আলোচনা
৫. গণ-আন্দোলন সম্বন্ধীয় পুস্তকের আলোচনা ও সংকলন
৬. প্রতি সংখ্যায় একখানি করিয়া ছবি
মানবতার পূজারি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অমূল্য কথা অত্যন্ত যত্নসহকারে প্রথম সংখ্যায় মুদ্রিত হয়- ‘এই যে বাঙ্গালার কৃষক সমস্ত দিন বাঙ্গালার মাঠে আপনার কাজ ও আমাদের কাজ শেষ করিয়া দিবাবসানে ঘর্মাক্ত কলেবরে বাঙ্গালার কুটিরে বাঙ্গালার গান গাহিতে গাহিতে ফিরিতেছে, তাহারা মুসলমান হউক, শূদ্র হউক, চণ্ডাল হউক, উহারা প্রত্যেকেই যে সাক্ষাৎ নারায়ণ।’
এই পত্রিকার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নজরুলের কবিতা। সেসব কবিতায় নজরুলের কবি মানসের আশ্চর্য উত্তরণ ঘটেছিল। প্রথম সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছিল- ‘এই সংখ্যায় লাঙলের সর্ব প্রধান সম্পদ কবি নজরুল ইসলামের কবিতা সাম্যবাদী।’
পত্রিকার পাঠকপ্রিয়তার অন্যতম কারণ নজরুলের চিন্তাশীল লেখনী। দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘খড়কুটো’ বিভাগে প্রকাশিত হয়- “গতবার আমরা ৫ হাজার ‘লাঙল’ ছেপেছিলাম- কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত কাগজ ফুরিয়ে যাওয়াতে কলকাতায় অনেকে কাগজ পাননি এবং মফস্বলে একবারেই কাগজ পাঠানো হয়নি। ওই সংখ্যার প্রধান সম্পদ কবি নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ গ্রাহকগণের আগ্রহাতিশয্যে পুস্তিকাকারে বের করা হলো, দাম করা হয়েছে মাত্র দু’আনা।”
লাঙল পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় নজরুলের কবিতা ‘কৃষাণের গান’, তৃতীয় সংখ্যায় ‘সব্যসাচী’, সপ্তম সংখ্যায় ‘অশ্বিনীকুমার’, নবম সংখ্যায় ‘শ্রমিকের গান’, দ্বাদশ সংখ্যায় ‘জেলেদের গান’, চতুর্দশ সংখ্যায় ‘সর্ব্বহারা’ প্রকাশিত হয়, যা প্রকৃত অর্থেই তৎকালীন সমাজকে প্রতিফলিত করে।
‘নতুন ভারত’ সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনা লাঙলের তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়- “তোমরা শূন্যে বিলীন হও, আর নূতন ভারত বেরুক। বেরুক লাঙ্গল ধরে’, চাষার কুটির ভেদ করে’, জেলে মালো, মুচি, মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে। বেরুক মুদীর দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে।”
লাঙল পত্রিকার পঞ্চম সংখ্যা বাংলা মায়ের কৃতী সন্তান সুভাষচন্দ্র বসুকে নিবেদন করা হয়েছিল।
চতুর্থ সংখ্যায় লেখা হয়েছিল- ‘আগামী বারে জনৈক কারারুদ্ধ আদর্শ দেশ ভক্তের পুণ্য-চরিত্র চিত্রনে লাঙলের বিশেষ সংখ্যা বহির হইবে।’ পঞ্চম সংখ্যায় সুভাষচন্দ্রকে আসন্ন জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখা হয়- ‘আগামী ২৩ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র ত্রিংশৎ বর্ষে পদার্পণ করবেন। তিনি শীঘ্র কারামুক্ত হয়ে এসে সহায়হীন শ্রমিক ও কৃষকদের মুক্তিপথে অভিযানের সেনাপতিত্ব গ্রহণ করুন এবং সফলকাম হয়ে শতবর্ষ পরমায়ু লাভ করুন, তার ত্রিংশ জন্মদিনে আমাদের এই শুভেচ্ছা।’
পত্রিকার শুরুতে সুভাষকে স্মরণ করে ‘জন্মোৎসবে’ শিরোনামে কবিতা লেখেন শ্রী নরেন্দ্র দেব। সুভাষের বাল্যকথা, সুভাষচন্দ্রের পত্রাবলি, দেশবন্ধু সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত সুভাষচন্দ্রের চিঠি, এমনকি সুভাষের রাশিচক্রও প্রকাশিত হয়।
কবিগুরু লিখেছিলেন-
বন্ধন, পীড়ন, দুঃখ, অসম্মান মাঝে
হেরিয়া তোমার মূর্ত্তি, কর্ণে মোর বাজে
আত্মার বন্ধনহীন আনন্দের গান,
মহাতীর্থ যাত্রীর সঙ্গীত, চিরপ্রাণ
আশার উল্লাস, গম্ভীর নির্ভয় বাণী
উদার মৃত্যুর।
পরবর্তী সংখ্যায় সুভাষচন্দ্রের বিলাতের পত্রাবলি প্রকাশিত হয়।
লাঙল পত্রিকার ত্রয়োদশ সংখ্যায় ‘রবীন্দ্রনাথের আশীর্ব্বচন’ সর্বাগ্রে মুদ্রিত হয়-
জাগো জাগো বলরাম
ধরো তব মরুভাঙা হল।
বল দাও ফল দাও
স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল।
এ ছাড়া বিভিন্ন সংখ্যায় শ্রী নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় কৃত ম্যাক্সিম গোর্কির জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস ‘মা’র বাংলা অনুবাদ, শ্রী দেবব্রত বসুর লেখা ‘লেনিন ও সোভিয়েট রুষিয়া’, শ্রী সুকুমার চক্রবর্তী ও শ্রী সুরেশ বিশ্বাসের লেখা ‘চীনের নবজন্ম’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। শ্রী হেমন্ত কুমার সরকার, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুজফ্ফর আহ্মদসহ অনেকের লেখাই লাঙল পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। ভারতীয় প্রথম কমিউনিস্ট কনফারেন্স, বগুড়া জেলা প্রজা কনফারেন্স, ময়মনসিংহ জেলা কৃষক শ্রমিক সম্মিলন, নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মিলনসহ তৎকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত বহু সম্মেলনের খবর প্রকাশিত হতো লাঙল পত্রিকায়।
লাঙল পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন বিশেষ গবেষণার দাবি রাখে। পরাধীন ভারতবর্ষে স্বদেশি ব্যবসার খবর অতি যত্নে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হতো। ৬ মার্চ, ১৯২৬ সালে বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের সাহায্যের জন্য কলকাতার এলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউস) অনুষ্ঠিত বসন্ত-উৎসবের বিজ্ঞাপন ছাপা হয় লাঙল পত্রিকায়। এভাবেই শতবর্ষ আগে প্রণম্য বাঙালিদের প্রজ্ঞাকে সঙ্গী করে সমাজের কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণার্থে, চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘লাঙল’ পত্রিকা তৎকালীন সমাজে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে।
লেখক: সোমঋতা মল্লিক
নজরুল সংগীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)