মালাগা থেকে ফিরে এখানে-ওখানে রাত কাটাচ্ছিলাম। মালাগা আমাকে দিয়েছে এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা; কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে আমি কারও সঙ্গে আলোচনা করতে চাইনে। অন্তত এই মুহূর্তে না। পরে বলা যাবে ওখানে আসলে কী ঘটেছিল। এখন বড়জোর বলা যায়, স্বপ্ন ব্যাপারটা ফালতু। যাকে বলে একটা ধোঁকাবাজি। মানুষের উচিত স্বপ্নকে নাকচ করে দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো, আর উচ্চারণ করা উচিত, ‘নিকুচি করি ওইসব স্বপ্নের, আমার
শেকড় আরও গভীরে প্রথিত, ইচ্ছেমতো বাতাস বইতে
দাও।’ কম বিফলতা ও ভাঙন নিয়ে জীবন অতিবাহিত করার একটাই পথ, অভিভূত না হয়ে অল্প একটুখানি নোংরা পানি পান করা।
অতএব আমি ‘রাম’-এ বুঁদ হয়ে রইলাম। সত্যি কথা বলতে কী, আমার এলোমেলো লক্ষ্যহীন জীবনযাপন কোনো সুফল বয়ে আনছিল না আমার জন্য। আমার আসলে প্রয়োজন ছিল আবেগপ্রবণতা ঝেড়ে ফেলে কোথাও একটা শেকড় গাড়া আর একটা মেয়ে খুঁজে নিয়ে মনপ্রাণ দিয়ে তাকে ভালোবাসা। খুব কঠোর হয়ে উঠেছিলাম। জানতাম আমার জন্য অপেক্ষা করছে দুই নারী- একজন রিওতে আর একজন বুয়েনোস আইরেসে। হাভানার কালো আর শংকর জাতের মেয়েদের কথা নাই বা বললাম। ওইসব নারীদের সঙ্গে আমার বিস্তর ঝামেলা ছিল।
দুপুরে গড়িয়ে নিলাম খানিকটা। আমার ঘর আট তলায়। আরও কয়েকটা ঘর আছে ওখানে, আমার মতো লোকজন থাকে। তাদের অনেকে আমার চেয়েও গরিব। তারা অবশ্য লেখাপড়া জানে না।
সে সময় দুটি মেয়ে ছাদে এসে মালিকনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুজন কালো লোকের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘এই এই, এখানে এসো, দেখতে দাও তোমাদের জিনিস দুটো? ছোট নাকি ওগুলো? হাহাহা, দেখতে দাও আমাদের। ওহো সত্যিই কি ওগুলো কালো? আরে ধুর, বের করো না, যাতে পুলিশ এসে পেয়ে যায় তোমাদের।’
আধা ঘণ্টা ধরে তারা গলা চড়িয়ে নিচের লোকগুলোর সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করল। ফলে ঘুমাতে পারছিলাম না। দরজার কাছে গিয়ে জোরে জোরে বললাম, ‘এই শোনো, তোমরা নিচে গিয়ে ওদের জিনিসগুলো নাড়িয়ে দিয়ে এসো। ঘুমাতে দাও আমাকে। যত্তসব উটকো ঝামেলা।’
‘ওরে শালা পেদ্রো হুয়ান, দিবানিদ্রা দিচ্ছ? তুমি কেন নিচে গিয়ে ওই কাজ করছ না, সোনামণি বুর্জোয়া শূকর ছানা।’
‘আমার ঠেকা পড়েছে নাকি? ওইসব কুকর্মে একেবারেই আগ্রহ নেই আমার। এরকম না করে তোমরা দুজনে এসে আমার কাছ থেকে একটু খোঁচা খেয়ে যাও, তার পর মানে মানে কেটে পড়।’
আরও কিছু হয়তো বলত তারা, হঠাৎ নিজেদের রুমে ঢুকে ‘সালসা’ গানের একটা টেপ চালিয়ে দিল। প্রচণ্ড শব্দাড়ম্বরপূর্ণ।
মাথাব্যথা শুরু হলো আমার। ভাগ্যিস আমার কাছে পিস্তলটিস্তল নেই। এরকম অবস্থায় আমার ভেতর অপরাধপ্রবণতা জেগে ওঠে।
উত্তেজনায় ফেটে পড়ছিলাম, রক্ত টগবগ করে ফুটছিল। আবার ছাদে গিয়ে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। আবহাওয়া ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফুঁসে উঠল প্রকৃতি।
ঘরে ফিরে এলাম। একটু পরে একটা ছেলে প্রতিবেশী ডালিয়ার কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এল। মুহূর্তের মধ্যেই উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। একটা বড় রকমের ঝড় এসে যদি আমার সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়, আমাকে যদি থাকতে হয় একটা ছাদবিহীন ঘরে, তাহলে অন্তত এসব ব্যাপার দেখতে হবে না। ধীর গতির নির্যাতন আর অণ্ডকোষে লাথির মৃদু আঘাত এক জিনিস নয়।
নিচে নামলাম। ডালিয়া একজন বৃদ্ধা। আমার নিচতলার প্রতিবেশী। মৃত্যুর প্রান্ত সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু তা সে বোঝে না। তার ঘর সাত তলায়। তার জন্য একটা কবজাবিহীন দরজা বানিয়ে দিতে বলল আমাকে। দরজাটা একটা ভাঙা বারান্দার সঙ্গে যুক্ত, যার দেওয়ালগুলো ফাটা। দরজাটা আমি বন্ধ করে দিলাম। এর মধ্যেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে। ঘরে পানি ঢুকছে চারদিক থেকে।
‘এভাবে বৃষ্টি চললে দরজাটা আমাদের চোখের সামনেই ভেঙে পড়বে ডালিয়া।’
‘ওরাই তো ভেঙে পড়তে দিচ্ছে। সরকার এই ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে না? বুড় হয়ে গেছি। সরকার কিছু করবে না আমার জন্য। এ পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা তুমি পাবে না, যেখানে সরকার সবকিছু করে দেয়। জায়গাটা যখন এর প্রকৃত মালিকের হাতে ছিল তখন ছিল একটা মূল্যবান সম্পদ। দেখতেও ভালো লাগত। মালিক কোনো কিছুতেই হাত লাগাতে দিত না। একটা পানির কল পর্যন্ত ফিট করতে হতো না আমাকে। সবকিছু দেখভাল করত সে, তবে এখানে কেবল পেশাজীবী, শিক্ষক কিংবা ব্যবসায়ীরা থাকত।’
‘বেশ ডালিয়া, সেসব সময়ের কথা এখন ভুলে যান।’
‘এখনো কি সেরকমই থাকা উচিত ছিল না বাছা? সবকিছু তো আর ভেঙে পড়তে পারে না। মানুষের পক্ষে সব সময় বেকার থাকা সম্ভব নয়। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে কেউ তাকে টাকাপয়সা দেবে না। তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই পেদ্রো, এসো আমার সঙ্গে।’
সে আমাকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে ওয়ারড্রব খুলে কিছু জামাকাপড়, একজোড়া জুতা, আর একটা পার্স দেখাল। সবই নতুন। সদ্য কেনা।
‘এসব কী ডালিয়া?’
‘কিছু গহনা বিক্রি করে এসব কিনেছি। কেন জানো? সারা জীবন গরিব আর ক্ষুধার্ত থাকতে চাই না। দিন তো ফুরিয়ে এসেছে। জানি সব শেষ হয়ে যাবে। বাইরে বেরোনোর মতো কিছু জামাকাপড় অন্তত একজন মানুষের দরকার। এমনকি হাঁটাহাঁটি করার জন্যও আলাদা পোশাকের প্রয়োজন। তার মানে এই নয়, একজন প্রেমিক খুঁজে বেড়াচ্ছি আমি। বুড় হয়ে গেছি না? কিন্তু তোমার পক্ষে তো এসব জানা সম্ভব নয়, তাই না? আসলে কেউ জানে না।’
‘নিশ্চয়ই ডালিয়া, সেই সময়টা ছিল একদম অন্যরকম। শেষ যে জিনিসটা আপনি হারিয়েছেন তা হচ্ছে আশা।’
কিছুক্ষণ আমরা বসে বসে গল্প করলাম। প্রতিবেশীরা বলে এ বৃদ্ধা এখনো কুমারী। বয়স তার ৮৩। তার বিশ্বাস একজন প্রেমিক সে খুঁজে পাবে আর বিয়ে করবে তাকে। অনেকবার সে তার জীবনের গল্প আমাকে শুনিয়েছে- কেমন করে যৌবনে মায়ামিতে গেছে, সবচেয়ে দামি দোকান থেকে নিজের জন্য কিনেছে সুন্দর সুন্দর জামা-জুতো। কেমন করে পিয়ানোতে সুর তুলেছে, আর অ্যামব্রয়ডারি করেছে কাপড়ে; কেমন করে তার কাতালান বংশোদ্ভূত বাবা বিশাল এক দোকানের মালিক হয়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন ১০৪ বছর বয়সে। নিজের মেয়েকে ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে দেননি, কারণ তার প্রেমিক বা পানিপ্রার্থী ছিল গরিব। কেমন করে তিনি অপেক্ষা করতেন কখন একজন ধনী যুবক তার কন্যাকে বিয়ে করতে এগিয়ে আসবে।
ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টি ক্রমে বাড়ছিল। আমি ঘরে ফিরে ঘুম দিয়েছিলাম। সেই সকালে ১৪ ঘণ্টাব্যাপী প্রবল ঝড় আর বৃষ্টিতে দেওয়াল ধসে পড়েছিল। সব ঘর থেকেই দেওয়াল ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা গিয়েছিল। এমনিতে ঘরটাকে পাকাপোক্ত বলে মনে হলেও দেওয়ালের নানা স্থানে ফাটল ধরেছিল। পানির তোড়ে নরম হয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
পুতুলের ঘরের মতো ছিল ভবনটা। একটা দেওয়ালও অবশিষ্ট নেই বলে ঘরের সব আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছিল। চিৎকার আর কান্নার শব্দ ভেসে আসতে থাকে। ধ্বংসস্তূপ থেকে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা দুটো লাশ উদ্ধার করে; কিন্তু তারা আমাদের ওখানে থাকতে নিষেধ করে না। জানায়, ভবনের বাকি অংশ ভালো আছে। এখনো নিরাপদ। যে ভবনটা বিধ্বস্ত হয়েছিল, আমার ঘর সেটার উল্টো দিকে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
সেদিন বিকেলেই ডালিয়ার ঘরে গিয়েছিলাম। ভয়ে সিঁটিয়ে ছিল সে। দেওয়ালের সঙ্গে তার ছোট্ট বাড়ির অর্ধেকটা ভেসে গেছে। তার রান্নাঘর, বাথরুম, একটা ঘরের সামনের দরজা আর প্রবেশ দ্বার রক্ষা পেয়েছে। জায়গাটা খুব সুন্দর ছিল। দরজার পাশেই একটা বড় গর্ত আর ৩০ মিটার রাস্তা। জায়গাটা ছিল অন্ধকারে ঢাকা। হঠাৎ আমি যেন এক দুঃস্বপ্নের ভেতর চলে গেলাম। বুড়ি কথা বলতে পারছিল না। ভয়ে নিস্তেজ হয়ে একটা চেয়ারে বসেছিল।…
বুড়ির কথা একসময় ভুলে গিয়েছিলাম। তখনো আমার নির্বিকার নিস্পৃহ জীবনযাপন অব্যাহত ছিল। মাসখানেক পরে জেনেছিলাম বুড়ি মারা গেছে। অন্য এক বুড়ি আমাকে বলেছিল, ‘ডালিয়া আসলে নিজেই নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। দেওয়াল ধসের পর থেকে সে খাওয়া-দাওয়া এক রকম ছেড়েই দিয়েছিল। ওখানেই থাকত গাদাগাদি করে। সারাক্ষণ একটা চেয়ারে বসে থাকত। যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। এক গ্লাস পানি পর্যন্ত গড়িয়ে খেতে পারত না। বার দুয়েক আমি তার জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমাকে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল সে। তার ব্যাপারে নাক গলাতে নিষেধ করেছিল আমাকে।’
অবশ্য তার ব্যাপারে আমার নিজেরও কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আমার প্রত্যাশা দু-একটা স্বপ্ন ঠিক রেখে ৮৩-তে পৌঁছে যাব, এমনকি ভালোবাসায় আস্থা রেখে পেয়ে যাব একজন বান্ধবী, বিয়ে করে ফেলব তাকে। এই বিশ্বাস আনব মনে- ভালোবাসা সম্ভব; আর দারিদ্র্য ও ক্ষুধা শিগগিরই আমার জীবনের অতীতের কোনো বিষয়ে পরিণত হবে।
লেখক: পেদ্রো হুয়ান গুতিয়েররেস (১৯৫০) কিউবা তথা লাতিন আমেরিকার খ্যাতনামা লেখক। ‘ডার্টি হাভানা ট্রিলোজি’ নামের উপন্যাসের জন্য দুনিয়াজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। বইটি কিউবায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে অশ্লীলতার অভিযোগে। তাকে ডার্টি রিয়েলিজমের লাতিন আমেরিকান গুরু বলে অভিহিত করা হয়। কবিতা, গল্প ও উপন্যাস মিলিয়ে গুতিয়েররেসের বইয়ের সংখ্যা ২৬। তিনি এখন বসবাস করেন হাভানা শহরে, আর সেখানে বসেই লেখালেখি করেন।