ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ মার্তিনেজকে ঘিরে নতুন শঙ্কা শাহবাগে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ নাটোরে ৭০ দরিদ্র রোগীর বিনামূল্যে ছানি অপারেশন চাকরি মেলায় সাড়া, রাজশাহীতে ৫০ শতাংশ প্রার্থীর তাৎক্ষণিক নিয়োগ ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন মাইকেল অলিভার ‘ফেনীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় ওছমান হারুন মাহমুদ দুলাল’ পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মিসরকে কেন জার্সি পরিবর্তন করতে বলল ফিফা? রবিবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবস যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায় রাজধানীতে প্রান্তিক গ্রামের ফুটবল উন্মাদনা, আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল ম্যাচ একদিনে ৫ মরদেহ উদ্ধার, বরগুনায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ দাউদকান্দিতে শিবির নেতার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায়কারীরা জনগণের বন্ধু নয়: তারেক রহমান মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করায় আনন্দ মিছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আগারগাঁওয়ে ‘রান ফর আর্থ’ আয়োজন সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি লেকে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু জনদুর্ভোগ নিরসন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি ডা. শফিকুর রহমানের ভারতীয় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে ধীরাজ শেঠ ‘তুই আসামি, চোখ নামিয়ে কথা বল’—ওসির বিরুদ্ধে নাঈম হাসানের অভিযোগ প্রযুক্তিদক্ষ তরুণরাই গড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী সোনারগাঁওয়ে উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক হবে: শিক্ষামন্ত্রী জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশ-বান্ধব পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ বিআইপির আলোচিত সিনেমার সিক্যুয়েল নিয়ে জয়া টেইলর সুইফটের নতুন রেকর্ড পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি?
Nagad desktop

অগ্নিবীণার চিরন্তন ঝংকার: নজরুল ও এক অবিনাশী মানবিক ভূগোলের অন্বেষণ

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
অগ্নিবীণার চিরন্তন ঝংকার: নজরুল ও এক অবিনাশী মানবিক ভূগোলের অন্বেষণ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সকালের রোদে যখন ধুলোবালি ওড়া শহরের ব্যস্ততা শুরু হয়, তখন কোথাও কি খুব গভীরে এক চিলতে উদাসীন হাওয়া বয়ে যায় না? সেই হাওয়া, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক ঝোড়ো মানুষের কথা, যিনি আজ থেকে বহু বছর আগে এই বাংলার মাটিতেই হেঁটেছিলেন মাথায় বাবরি চুল, চোখে আগ্নেয়গিরির জ্বালা আর হৃদয়ে শ্রাবণের মেঘের মতো করুণা নিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম। তার নামটা নিলেই মনে হয় যেন এক বন্ধ জানালা হঠাৎ করে খুলে গেল, আর ঝোড়ো বাতাস এসে লন্ডভন্ড করে দিল ঘরের সাজানো-গোছানো কৃত্রিমতাকে।

নজরুলকে কি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়খণ্ডে আটকে রাখা সম্ভব? বিংশ শতাব্দীর সেই উত্তাল দিনগুলো যখন ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল উপমহাদেশ, তখন নজরুল এসেছিলেন এক ধূমকেতুর মতো। কিন্তু আজ, ২০২৬-এর এই অতি-আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও কেন তার কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে? কেন মনে হয়, আমাদের আজকের এই তথাকথিত সভ্যতার যাবতীয় সংকটের দাওয়াই তার সেই জীর্ণ পঙ্‌ক্তিগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে? মহাকালের বিশাল ক্যানভাসে কিছু নক্ষত্র থাকেন যারা আলো দেন, কিন্তু নজরুল ছিলেন সেই দাবানল, যা জঞ্জাল পুড়িয়ে দিয়ে নতুন প্রাণের অঙ্কুরোদ্গমের ক্ষেত্র তৈরি করে।

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির কথা ভাবলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালের সেই ডিসেম্বর রাত, যখন এই যুবক কবি পেনসিল হাতে লিখে চললেন এক মহাকাব্যিক স্পর্ধা। কিন্তু এই দ্রোহ কি কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর জন্য ছিল? একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল মানুষের ভেতরের সেই ভীরুতা আর দাসত্ববৃত্তির বিরুদ্ধে। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে যখন তার ‘উবারমেনশ’ বা অতিমানব তত্ত্বের অবতারণা করেন, তিনি চেয়েছিলেন এমন এক মানুষ, যে প্রচলিত নৈতিকতার শেকল ছিঁড়ে নিজের ভাগ্য নিজে গড়বে। নজরুল যেন সেই নিৎশের তত্ত্বকেই এক পরম মরমি ও মানবিক রূপ দিলেন। নিৎশের অতিমানব অনেকটা শীতল, ক্ষমতাশালী; কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাটি প্রচণ্ড আবেগী। তিনি একদিকে বলছেন, ‘আমি মেদিনী-নভ-আকাশ ছাপিয়া/ আমি নিখিল বিশ্ব-প্লাপিয়া’, আবার পরক্ষণেই বলছেন, ‘আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি বঞ্চিতের!’

এখানে শক্তির সঙ্গে করুণার এক অদ্ভুত মিশেল, এটাই নজরুলকে অনন্য করে তোলে। নজরুলের দ্রোহ কোনো অন্ধ ধ্বংস নয়। হেগেলীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে, এটি সেই ‘নেগেশান’ বা অস্বীকার, যা নতুন এক সুন্দর আগামীর পথ প্রশস্ত করে। তিনি যখন নটরাজের মতো ধ্বংসের নৃত্য নাচেন, তখন আসলে তিনি জরাগ্রস্ত সমাজটাকে নাড়িয়ে দিতে চান। বর্তমানের এই করপোরেট-শাসিত পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ নিজের অজান্তেই যন্ত্রের দাসে পরিণত হচ্ছে, সেখানে নজরুলের এই ‘দুর্দম’ হওয়ার ডাক কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল না? 

নজরুলকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে। কিন্তু ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দটি বড্ড বেশি শুষ্ক, বড্ড বেশি রাজনৈতিক। নজরুল যা ছিলেন, তাকে হয়তো ‘মরমি মানবতাবাদ’ বলাই ভালো। হোমি কে. ভাবা যখন ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকরত্বের তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান, নজরুল তার অনেক আগেই প্রাত্যহিক জীবনে সেই সংকরত্বকে যাপন করেছেন। তিনি যখন লিখছেন- ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’, তখন তা কেবল সস্তা আবেগ ছিল না। এটি ছিল এক গভীর দার্শনিক অবস্থান।

সিমন দ্য বোভোয়ার যখন ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লিখে বিশ্ব কাঁপিয়ে দিলেন, তার অনেক আগে এই বাংলার এক প্রান্তিক কবি নারীর অধিকার নিয়ে এমন সব কথা বলে গেছেন যা আজও সমাজের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের কাছে হজম করা কঠিন। নজরুল লিখেছিলেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এই পঙ্‌ক্তিটি যখন তিনি লিখছেন, তখন নারী শিক্ষা বা ক্ষমতায়ন নিয়ে সমাজ মোটেও উদার ছিল না।

নজরুলের নারীবাদ কেবল অধিকারের দাবি নয়, তা ছিল নারীর অন্তর্গত ঐশ্বরিক শক্তিকে বা ‘ফেমিমাইন এনার্জি’কে স্বীকৃতি দেওয়া। তিনি নারীকে কেবল ভোগের সামগ্রী বা গৃহকোণের অলংকার হিসেবে দেখেননি। তার কাছে নারী ছিল জননী, ভগিনী এবং সর্বোপরি এক তেজস্বী সহযোদ্ধা। ফরাসি নারীবাদী চিন্তায় ‘এক্রিচার ফেমিনিন’ বা নারীর নিজস্ব বয়ান তৈরির যে কথা বলা হয়, নজরুল যেন তার কবিতায় সেই ভাষারই এক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তার ‘বারাঙ্গনা’ কবিতার মতো সাহসী উচ্চারণ বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সমাজ যাদের ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, নজরুল তাদের মাথায় করে রেখেছেন। তিনি জানতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজের অর্ধেক অংশকে অন্ধকারে রাখা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আলোই পূর্ণতা পাবে না। 

কার্ল মার্কস যখন পুঁজিবাদের শেষ দেখে ফেলেছিলেন তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়, নজরুল তখন সেই পুঁজিবাদের বিষদাঁত অনুভব করছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষের চোখের জল দেখে। নজরুলের সাম্যবাদ কোনো বিদেশি আমদানি করা ফর্মুলা ছিল না, তা ছিল তার জীবন থেকে উঠে আসা এক সত্য। তিনি যখন ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় লেখেন, ‘রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে/ রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে’, তখন তিনি এক অতি-আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার ব্যবচ্ছেদ করছেন। এই কলকারখানার ধোঁয়ার আড়ালে যে মেহনতি মানুষের রক্ত ঘাম হয়ে ঝরছে, তাদের কথা বলার মতো সাহস কজনের ছিল?

উত্তর-ঔপনিবেশিক বা পোস্ট-কলোনিয়াল তাত্ত্বিকরা যে ‘সাবঅল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়ার কথা বলেন, নজরুল সেই কণ্ঠস্বর হয়েই জন্মেছিলেন। তিনি শোষিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই হয়তো রাজরোষে পড়তে হয়েছে বারবার। তার সাম্যবাদ কেবল রুটি-রুজির বণ্টন নয়, বরং সম্মানের ভাগাভাগিও। আজকের এই আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর জাঁকজমকপূর্ণ শপিং মলের নিচে যারা ধুঁকছে, যারা প্রতিদিনের অন্নের জন্য নিজেকে বিক্রি করে দিচ্ছে, তাদের জন্য নজরুল আজও সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নেতা। তিনি শিখিয়েছিলেন, হাতুড়ি আর কাস্তে কেবল হাতিয়ার নয়, তা নতুন ইতিহাস গড়ার কলম। নজরুলের সর্বহারা ভাবনায় যে আধ্যাত্মিক স্পর্শ ছিল, তা রুশ বিপ্লবের যান্ত্রিক সাম্যবাদের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও টেকসই।

নজরুলের কথা বলতে গেলে তার সংগীতের মহাসমুদ্রকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। ৩০০০-এর বেশি গান ভাবলে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতে হয়। কীভাবে একজন মানুষ এত রকমের সুর নিজের ভেতরে ধারণ করতে পারেন? নজরুল ছিলেন এক নিপুণ রসায়নবিদ, যিনি ধ্রুপদী সংগীতের রাগের সঙ্গে মাটির মেঠো সুরের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। 

একদিকে তার গজলগুলো যখন বিরহী হৃদয়ে তুফান তোলে, অন্যদিকে তার ‘কারার ঐ লৌহকবাট’ শুনলে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক আদিম নেশা জেগে ওঠে। বাংলার লোকজ সুরকে তিনি এক নতুন কৌলীন্য দান করেছিলেন। তার গানের প্রতিটি লয়, প্রতিটি তান যেন একেকটি অনুভূতির মহাকাব্য। নজরুলসংগীতের বড় সার্থকতা হলো এর গণমুখী চরিত্র। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সবখানেই নজরুলের গান ছিল যোদ্ধাদের প্রধান জ্বালানি। আজও যখন কোনো তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে, অবচেতনেই কি তার ঠোঁটে নজরুলের গানের লাইনগুলো খেলা করে না? সংগীত তাত্ত্বিকদের মতে, নজরুল প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সুরের মাঝে এমন এক সেতুবন্ধন করেছিলেন, যা আজ ২০২৬ সালেও আমাদের সংগীতে আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয়।

নজরুল যখন বাংলা সাহিত্যে এলেন, তখন রবীন্দ্র-প্রভাব এতই প্রবল যে অন্য কারও পক্ষে নিজের কণ্ঠস্বর শোনানো ছিল দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু নজরুল কোনো নিয়ম মানার পাত্র ছিলেন না। মিখাইল বাখতিন সাহিত্যের যে ‘হেটেরোগ্লোসিয়া’ বা বহুস্বরবাদের কথা বলেছিলেন, নজরুলের ভাষায় তা একদম জীবন্ত। তিনি তৎসম শব্দের পাশে অনায়াসে বসিয়ে দিলেন আরবি, ফারসি আর তুর্কি শব্দ। ভাষার এই যে গণতান্ত্রিকীকরণ, এটাই ছিল নজরুলের ভাষাতাত্ত্বিক বিপ্লব।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভাষা কোনো পবিত্র জাদুঘর নয়, বরং ভাষা হলো প্রবহমান নদীর মতো। ‘খুন’, ‘ইনকিলাব’, ‘জিন্দাবাদ’ এই শব্দগুলো তার জাদুকরী স্পর্শে বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। তার শব্দচয়ন ছিল যেন তলোয়ারের ঝিলিক। তিনি ভাষার আভিজাত্য ভেঙে তাকে সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে মেঠোপথ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। আজ যখন আমরা বিশ্বায়নের চাপে নিজের ভাষা ও শিকড় হারিয়ে ফেলার ভয়ে থাকি, তখন নজরুলের এই উদার ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায় যে, পরকে আপন করতে পারলেই নিজের ভাষা সমৃদ্ধ হয়।

হেনরি বার্গসঁ তার দর্শনে ‘এলান ভাইটাল’ বা প্রাণশক্তির যে প্রবাহের কথা বলেছেন, নজরুলের পুরো জীবনটাই যেন ছিল সেই শক্তির এক মূর্ত প্রকাশ। তিনি তারুণ্যের উপাসক ছিলেন। তার কাছে ‘যৌবন’ মানে কেবল বয়সের একটি সংখ্যা নয়, বরং তা হলো অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার এক মানসিক অবস্থা। 

তিনি ধ্বংসকে ভয় পেতেন না, কারণ তিনি জানতেন পুরোনোকে ধ্বংস না করলে নতুনের অভিষেক সম্ভব নয়।  জীবনের প্রতি এক অদ্ভুত টান, মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করা এটাই নজরুলকে কালোত্তীর্ণ করেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন মানে থমকে যাওয়া নয়, জীবন মানে অবিরাম ছুটে চলা। তার কবিতায় এই ‘ভাইটালিজম’ বা জীবনীশক্তিই হলো বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক পুঁজি।

প্রশ্ন জাগতে পারে, এত বছর পর, এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে নজরুলের সেই আগুন-পাখি সত্তার প্রয়োজন কী? উত্তরটা খুব সহজ। মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের সংকটগুলো আজও মেটেনি। থিওডর অ্যাডর্নো আউশভিৎস ট্র্যাজেডির পর কবিতা লেখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু নজরুল যেন আমাদের দেখিয়েছিলেন যে, চরম অন্ধকারেই কবিতার মশাল সবচেয়ে বেশি জরুরি।

নজরুল কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সমাজসংস্কারক। তার ‘ধূমকেতু’ বা ‘লাঙল’ পত্রিকাগুলো যে আগুনের ফুলকি ছড়িয়েছিল, তা আজও যেকোনো মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য পাঠ্য। ব্রিটিশদের জেলে বসে তিনি যখন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ লিখছেন, তখন তিনি কেবল নিজের জন্য লড়ছিলেন না, তিনি লড়ছিলেন সারা বিশ্বের লাঞ্ছিত মানুষের হয়ে। তার সেই তেজ, সেই আপসহীনতা আজকের এই সুবিধাবাদী ও স্বার্থপর পৃথিবীর সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলাম কোনো পাথরের মূর্তিতে বন্দি নাম নন। তিনি এক চিরকালীন স্রোত। সময় বদলায়, রাজনীতির মেরুকরণ হয়, মানচিত্রের রং পাল্টে যায়, কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো সাম্য, প্রেম আর স্বাধীনতা একই থেকে যায়। নজরুল সেই চিরন্তন চাহিদারই এক শব্দরূপ। তাকে পাঠ করা মানে হলো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আসল চেহারাটা দেখা।

হয়তো আজও মহাকালের কোনো এক অলিন্দ থেকে নজরুলের সেই বজ্রকণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয় ‘আমি সেইদিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না।’ সেই দিন কি আজও এসেছে? পৃথিবী কি শান্ত হতে পেরেছে? উত্তর হয়তো আমাদের সবারই জানা। আর ঠিক এই কারণেই নজরুল আজও আমাদের সঙ্গে আছেন, থাকবেন। যতদিন বিশ্বে কোনো এক কোনে একটি মানুষও শোষিত হবে, ততদিন নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ বাজতেই থাকবে। তিনি কোনো অতীত নন, তিনি আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক অবিনাশী ধ্রুবতারা। নজরুলের অন্বেষণ আসলে মানুষের নিজের হারানো দেবত্বকে খুঁজে পাওয়ারই এক পরম আখ্যান। তার সেই দ্রোহ, সেই প্রেম আর সেই সাম্যের গান আমাদের ধমনিতে মিশে থাকুক রক্তকণিকা হয়ে, এটুকুই প্রত্যাশা।

কবিতা হেলিওস

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
হেলিওস

একটা অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

          অর্ধবৃত্তের মতো অবকাশ রচনা করেছি

 

আছে মা-পাখির ডিম ভেঙে যাবার প্রতিকল্পে

            সর্বজনীন বেদনা

বৃদ্ধ বাবার ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর এক বুকচাপা

            দীর্ঘশ্বাসের সীমিত চতুর্ভুজ

রানা প্লাজাসদৃশ ব্যথিত পাণ্ডুলিপি

তরতাজা যুবকের গুম হওয়ার ন্যায়

                   একটা দীর্ঘ সকাল

আছে মায়ের জেগে থাকা চোখ

আছে একজোড়া

            সুসিদ্ধ ইকোলজি

আছে বোনের ব্যবহৃত কাঁকড়া ক্লিপের উদার সৌন্দর্য

আছে একটা গামছায় হাত মোছার দুটো অবিকল সবাক ছবি

 

এই তো আমার রূপকল্পের ইতিবৃত্ত

 

 এখন কোনো অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

            আমি পূর্ণবয়স্ক অবকাশ রচনা করব

জীবনের সব হুলস্থূল এনে ভরে রেখে দেব

 

 দ্যাখো, হেলিওসের মতোনই তোমাদের কাছে যাব আমি

 

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

গহিন অতলের অবাধ চত্বরে বৈভবে থাকে

তাকে কি টুকরো টুকরো করা যায়

অবয়বে বেড়ে ওঠে না কস্মিনকালে

এক টুকরোই থেকে যায় আদিঅন্ত কাল

ভূমিদস্যুরা তবু ওই জলা দখলে মত্ত হয়

বেপরোয়া ছুরি-কাঁচির নির্মমতায়

ঝরনার উৎস স্তব্ধ করে

ফালি ফালি করা অবয়ব থেকে বেরোয়

অজস্র শোণিত ধারা

নদী পর্যন্ত যেতে পারে না শুকিয়ে জ্বলে

ভেসে ভেসে বেড়ায় নিশ্চিহ্ন কাঠামো

নিক্ষিপ্ত হয় মর্তের ঝড়ে

মর্গের ব্যবচ্ছেদে খুঁজে পায় না শিশু আত্মা

পায় শুধু

ছোট্ট এক টুকরো জীবনের অবিকাশ! অবিকাশ!

কবিতা অধরা ও কবি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
অধরা ও কবি

অধরা

সময়ের বেড়াজালে বন্দি খাঁচায়

দূর পানে চেয়ে থাকি তোমার আশায়

উজান সময় স্রোতে এই অবেলায়

তুমি আসবে তো? ভালোবাসবে তো?

 

কবি

কী আছে তোমার? অর্থ, বিত্ত, বৈভব?

প্রভাব, প্রতিপত্তি? বলো, চুপ থেকো না

, এসব তোমার নেই! এবার, তুমিই বলো

আমি কেমন করে তোমার কবিতা হই?

কেমন করে তোমার কাছে আসি

কেমন করে তোমায় ভালোবাসি?

কবিতা প‌রিণ‌তি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম
প‌রিণ‌তি

কালো চিমনিরধোঁয়ায় আকাশের বুকজুড়ে মে কালোমেঘ

মৃত পাখির বাসা সে ড়ে রক্তাক্ত নে

্যামল বাগানগুলো ড়ে আছে যুদ্ধাহত ক্ষতবিক্ষত সৈনিকের তো

জ্বলন্ত কয়লার পাহাড়,

জাগিয়ে তোলে মাটির গহ্বরে ঘুমিয়ে থাকা আগুনকে

প্লাস্টিকের সমুদ্দুর,

ক্ষুধার্ত দৈত্যের তো গিলে খাচ্ছে পৃথিবীকে

যুদ্ধের দামামা পোড়ামাটির ্যস বাড়াতে থাকে শুধু

বোমার ব্দে রে পড়ে পাখির পালক,

আকাশের নীল রং

ভাঙা কাচ য়ে আছড়ে ড়ে মিনে

পৃথিবীর কপালে আগুনের থার্মোমিটার

কামারের হাতুড়ির তো আছড়ে ড়ে উন্মত্ত রোদ

জ্বরে পোড়া পৃথিবীর গা থেকে ঝরতে থাকে বরফ অবিরাম

বৃদ্ধের শুভ্র দাড়ির তন

 

ক্ষুধার্ত সমুদ্র গিলে খায়,

মানুষের স্বপ্নে বোনাউঠোন

তৃষ্ণার কঙ্কা মিনে আঁকে ছড়ানো মানচিত্র

নদীর তীর ক্ষুধার্ত ষাঁড়ের তো গ্রামে ঢুকে ড়ে পাখির কিচিরমিচির বাজেয়াপ্ত হয় কোনো এক ভোরে,

বাড়তে থাকে ছিন্নমূল মানুষের ভেলা,

পৃথিবীর জ্বর নামানোর দাওয়াই খুঁজতে,

লি থেকে মাথাগুলো জড়ো হয় জাতিসংঘের টেবিলে

কথার খই ফোটে, বে চোখ বাঁধা থাকে কালো ফিতায়

 

কবিতা বলির আগে

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
বলির আগে

আমার কথার পরে যদি কোনোদিন

ব্যথা পেয়ে থাকো

যদি এই দুর্দিনে সমূহ বিপদে মনে করো

ডাক দিও কোনো এক নির্মম সকালে

 

আমার বুকেরপরে দূর্বা যেমন থাকে

বেদনায় নীলপদপিষ্ট হলুদ সোহাগে

একবার চোখের জলে ধুয়ে নিও

সকল কলুষতাযেভাবে ধর্ম ছাগ

বলির আগে মুছে ফেলে যত ক্লেদ