‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।’ শুরু হয়েছে ভাষা আন্দোলনের রক্তে রাঙা ফেব্রুয়ারি। বাঙালির কাছে এই ফেব্রুয়ারি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল স্মৃতিমাখা এ মাস এলেই গভীর শ্রদ্ধায় মনের মধ্যে ভিড় করে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার ও শফিউরদের নাম। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তারা। তাদের এ আত্মত্যাগেই বাঙালি তার ভাষাভিত্তিক পরিচয় লাভ করে এ মাসে। এই সব বীর শহিদদের বুকের রক্তে লেখা ইতিহাস থেকে সঞ্চিত শক্তি পরবর্তী সময়ে প্রেরণা জুগিয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের, যার মধ্য দিয়ে এসেছে স্বাধীনতা।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো ১৯৯৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পায়। এর মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে যায় ভাষার দাবিতে বাঙালির লড়াইয়ের গৌরবময় ইতিহাস। সেই থেকে দিবসটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে।
গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা। গত শনিবার এই বইমেলা উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল রবিবারেও ছিল বিভিন্ন কর্মসূচি।
পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভায় বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু- অন্য কোনো ভাষা নয়।’
এরপর কার্জন হলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলার পর কয়েকজন ছাত্র ‘না’ ‘না’ বলে চিৎকার করে প্রতিবাদ করেছিলেন- যা জিন্নাহকে অপ্রস্তুত করেছিল। এই ঘটনার পর জিন্নাহকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিল একদল ছাত্র। এতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন।
এর আগে ব্রিটিশ শাসকদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার ঠিক পর পরই ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও অধ্যাপক মিলে তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তারা শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে নানারকম সভা-সমিতি ও আলোচনা সভার আয়োজন করে আসছিলেন। গঠিত হয়েছিল ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার আন্দোলন জোরদার করে তোলে এই সংগঠন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। এই আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই আদেশ অমান্য করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে নিহত হন সালাম, জব্বার, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে। এরপর পথপরিক্রমায় রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা। সেই পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরে ৯ মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।