দখলদার দেশ ইসরায়েল কর্তৃক অধিকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের ছোট শহর বেথলেহেম। এই শহরকে বড়দিনের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ এই শহরেই যে যিশুখ্রিষ্টের জন্ম! কিন্তু এ বছর এই শহরের অবস্থা দেখে বোঝার উপায় ছিল ন যে , বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) ছিল যিশুর জন্মদিন।
সাধারণত বড়দিন উপলক্ষে পুরো ডিসেম্বর মাস দর্শনার্থীতে মুখরিত থাকে বেথলেহেম। কিন্তু এবার সেখানকার রাস্তায় সব সময়ের মতো মনোমুগ্ধকর সজ্জা ছিল না। যিশুর জন্মস্থলে নির্মিত নেটিভিটি গির্জার সামনে বৃহদাকৃতির ক্রিসমাস ট্রি বসেনি এবার। কারণ গাজা যুদ্ধের কারণে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বড়দিনের উদযাপন বাতিল করা হয়েছে বেথলেহেমে। ফিলিস্তিনের খ্রিষ্টানরা শুধু ধর্মীয় এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতেই অংশগ্রহণ করছেন।
নেটিভিটি গির্জার যাজক ড. মান্থার আইজ্যাক আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘এটা আনন্দ এবং উদযাপনের সময় হওয়া উচিত। কিন্তু গাজায় আমাদের ভাইবোনদের সঙ্গে একাত্মতার কারণে বেথলেহেম এখন দুঃখের শহর।’
নেটিভিটি গির্জায় গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছোট্ট যিশু (যিশুর মূর্তি) শুয়ে আছেন। গাজার বিপর্যয়কর পরিস্থিতির প্রতি সমবেদনাস্বরূপ এই ব্যবস্থা করা হয়েছে গির্জায়। যাতে পুণ্যার্থীরা প্রার্থনার সময় গাজাবাসীর কথাও স্মরণ করেন।
আইজ্যাক দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘এটা বিশ্বাস করা কষ্টকর যে বছর ঘুরে আরেকটি বড়দিন চলে এসেছে, কিন্তু গণহত্যা এখনো বন্ধ হয়নি। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা গণহত্যা চালিয়ে যেতেই যেন আনন্দ পাচ্ছেন। তাদের কাছে ফিলিস্তিনিরা পরিহার্য।’
কিন্তু ইসরায়েল বারবার গাজায় গণহত্যা সংঘটনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা একটি গণহত্যা মামলার রায় এখন পর্যন্ত দিতে পারেননি আদালত।
বেথলেহেমের অনেক খ্রিষ্টান হতাশ এবং উদ্বিগ্ন, কারণ তারা মনে করেন বিশ্বের অন্যান্য খ্রিষ্টান সম্প্রদায় তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না এবং গাজায় ঘটে যাওয়া সমস্যার বিষয়ে আওয়াজ তুলছে না। ফিলিস্তিনের ক্ষুদ্র খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যকার বন্ধন বেশ দৃঢ় এবং বেথলেহেমের স্থানীয়দের অনেকের আবার গাজায় পরিবার এবং বন্ধুবান্ধব রয়েছে। গাজা শহরের অধিবাসী (বর্তমানে গাজার বাইরে) ধর্মতত্ত্ববিদ ড. জোসেফ খৌরি বলেন, ‘আমার মা আমাকে বলেছিল যে আমরা টেলিভিশনে গাজা সম্পর্কে যা জানছি, তা সত্যিকারার্থে সেখানে যা ঘটছে তার এক শতাংশও প্রতিনিধিত্ব করে না।’ জোসেফের মা-বাবা এবং বোন সেই কয়েক শ খ্রিষ্টানের অংশ, যারা গত ১৪ মাসের বেশির ভাগ সময় গাজায় অবস্থিত দুটি গির্জায় কাটিয়েছেন।
তাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে জোসেফ বলেন, ‘তারা অন্য সব গাজাবাসীর মতো অনাহারে আছেন। নিঃসন্দেহে বেশির ভাগ সময় ধারাবাহিক বোমার শব্দে এবং চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় পরিষেবার অভাবে নির্ঘুম কাটান। আমরা বন্ধু এবং পরিজন হারিয়েছি।’
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এর উত্তেজনা পশ্চিম তীরেও গড়িয়েছে। ইসরায়েল সেখানকার ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ১০ হাজারের বেশি কর্মীর কাজের অনুমোদন বাতিল করেছে। যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে জেরুজালেমে অথবা ইহুদি বসতিগুলোতে প্রতিদিন কাজে যেত। ফলে সেখানকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, বিশেষত বেথলেহেমে। কারণ এই শহরের অর্থনীতি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। যেটি ১৪ মাস ধরে একপ্রকার বন্ধই বলা চলে। সূত্র: বিবিসি