ছবি: সংগৃহীত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। গত বুধবার সমঝোতা স্মারকটি ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং তা এখন কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে উভয় দেশ। তবে চুক্তি হলেও অমীমাংসিত রয়ে গেছে গুরুপ্তপূর্ণ বিষয়গুলো।
এদিকে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিজয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের দেওয়া এক নতুন তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষ করে ইরান যাতে ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে; এই বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
যদিও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি নিশ্চিত করে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র কিনবে না, তৈরি করবে না বা উৎপাদন করবে না। কিন্তু এই চুক্তির খসড়া সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এখন আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হচ্ছে। এই দুই মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একটি স্থায়ী পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। অথচ ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি করতে ওবামা প্রশাসনের প্রায় ২০ মাস আলোচনা করতে হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প প্রশাসন কি মাত্র দুই মাসে সেই কঠিন কাজটি করতে পারবে?
এদিকে চুক্তির খসড়ায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে ইরান শুধু তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এটিকে ইরানের ‘গুরুত্বপূর্ণ ছাড়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আবার ইরানকে কোনো অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে না বলে পুনরায় জানিয়েছেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। তাই অর্থের বিষয়টি বর্তমান চুক্তিতেও ট্রাম্পের জন্য একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পুনর্গঠনের জন্য আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চূড়ান্ত ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে এক পয়সাও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি ওয়াশিংটন। চুক্তির ভাষা বেশ অস্পষ্ট। ফলে ভবিষ্যতে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা অর্থ প্রদানের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি বলেই মনে করছেন তিনি।
এই চুক্তির পর পরই ট্রাম্পের নিজ রাজনৈতিক দলসহ অনেকেই তার সমালোচনা শুরু করেছেন। এ ছাড়া কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারা এই চুক্তি এবং এর সঙ্গে জড়িত অনিশ্চয়তাগুলো সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ব্রিফিং ও তথ্য দাবি করছেন। অনেক রিপাবলিকান এই চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। একজন বিশিষ্ট রিপাবলিকান সিনেটর এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছেন এবং বিনিময়ে যথেষ্ট পাননি। এদিকে লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি এক্স-এ একটি পোস্টে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমন করা যায়নি। তারা শিখেছে যে হরমুজ প্রণালিকে হুমকি দেওয়া আসলে কার্যকর এবং নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে তারা এটিকে কাজে লাগাবে। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তিটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতিগত ভুল।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরান যেন মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে, বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে অর্থ ও সহায়তা দিতে না পারে। ইসরায়েলেরও বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল এটি। তাই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে এই যুদ্ধে অংশ নেয় এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযান চালায়। বর্তমান চুক্তির আওতায় হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতও বন্ধ থাকবে। তবে চুক্তিতে গোষ্ঠীটির বিষয়ে আর তেমন কোনো উল্লেখ নেই। পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানকে হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে চাপ দেওয়া হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত বুধবার প্রকাশিত চুক্তির খসড়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত কোনো উল্লেখ নেই। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তাই জেনেভায় স্বাক্ষরিত চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সমঝোতায় রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সূত্র: বিবিসি