বছর দুয়েকের বেশি হলো বিশ্বে করোনার প্রাদুর্ভাব তেমন একটা নেই। মানুষ এখন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে। স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু সেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি হয়তো আর বেশি দিন থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে আবার করোনার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বিশ্বের ২২টি দেশে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, আবার কি বিশ্বে ফিরে আসছে করোনা?
সংবাদদাতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সপ্তাহে অন্তত করোনায় ৩০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। আর ভারতেও এই রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। ভারতজুড়ে অন্তত ১০০০-এর বেশি মানুষ করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছেন।
ধারণা করা হয়ে থাকে, চীন থেকে প্রথম করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছিল। বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ব্যক্তির কথা প্রথম জানা যায় ৮ মার্চ, ২০২০ সালে। প্রথম মৃত্যুটি ঘটে ১৮ মার্চ, ২০২০ সালে। এরপরের দুই মাস দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ৩ অঙ্কের মধ্যে ছিল, যা বাড়তে বাড়তে জুলাই মাসে সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল। ২ জুলাই সর্বোচ্চ ৪০১৯ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বাংলাদেশেও।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ভয়াবহ
যুক্তরাষ্ট্রের করোনা পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুয়ায়ী, গত মাসের প্রতি সপ্তাহে সেখানে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন করোনায়া। তবে দেশটির পরিস্থিতি কয়েক বছর আগের চেয়ে অনেক ভালো। এবিসি নিউজ করোনার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে’ বলে উল্লেখ করেছে। ডিউক ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. টনি মোডি এবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই মৃত্যু দেখছি। করোনা ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাকসিনের স্বল্প প্রয়োগ, রোগ প্রতিরোধ শক্তির হ্রাস এবং এই চিকিৎসার অপ্রতুলতা মৃত্যু ডেকে আনছে। সিডিসি সংক্রমণের জন্য নতুন ভ্যারিয়্যান্ট এনবি.১.৮.১.কে দায়ী করেছে। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভ্যারিয়েনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
এশিয়াতেও বাড়ছে সংক্রমণ
সংবাদদাতারা বলছেন, কোভিড-১৯-এর সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সপ্তাহে হংকং, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে সংক্রমণের হার বেড়েছে। সিঙ্গাপুর ও হংকং কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত দেশটিতে ১৪ হাজার ২০০ করোনা সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে।
ভারতে দ্রুত ছড়াচ্ছে নতুন ভ্যারিয়েন্ট
হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, ভারতেও করোনার সংক্রমণ বেড়েছে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে। তবে দেশটিতে এখনো মোটা দাগে করোনার প্রভাব পড়েনি। ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ করা তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, গত ১২ মে থেকে করোনা সংক্রমণের অন্তত ১৬৪টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। গত মঙ্গলবার এক দিনেই ২৫৭টি সংক্রমণের তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। জাতীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, জরুরি ওষুধ বিতরণ বিভাগ, দুর্যোগ ব্যস্থাপনা সেলসহ চিকিৎসা সংগঠনের বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈঠক করেছেন।
ভারতের মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, কেরালা ও তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোতে সংক্রমণ বৃদ্ধির চিত্র দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি অমিক্রনের একটি নতুন ভ্যারিয়েন্ট। আক্রান্তদের মধ্যে সাধারণত হালকা উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, যেমন মাথাব্যথা, গলা খুসখুসে, জ্বর, সর্দি, পেটব্যথা বা পাতলা পায়খানা। বেশির ভাগ রোগী চার দিনের মধ্যেই সেরে উঠছেন। ভারতজুড়ে কেন এত করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, তা নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, করোনার নতুন সংক্রমণের নেপথ্যে উঠে আসছে নতুন ভ্যারিয়েন্ট NB.1.8.1.।
খবরে বলা হয়েছে, ওড়িশায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩২ জন। কর্ণাটকে আক্রান্ত এর সংখ্যা ৩৮ জন, যার মধ্যে বেঙ্গালুরুতেই ৩২ জন। সেখানে করোনা আক্রান্ত ৮৪ বছরের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। কর্ণাটক স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর পর তার করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। কেরালায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৭৩ জন। তামিলনাড়ুতে ৬৬ জন। মহারাষ্ট্রে ৫৬ জন, যার মধ্যে মুম্বাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। দিল্লিতে আক্রান্ত হয়েছে ২৩ জন, অন্ধ্রপ্রদেশ ৪, উত্তরপ্রদেশ ৪, পদুচেরিতে ১২, গুজরাটে ৭ আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। গুজরাটে নতুন ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখানকার ৪ জন করোনার নতুন প্রজাতি এলএফ.৭–এ আক্রান্ত হয়েছেন। উত্তরাখন্ডে ৩ জন, রাজস্থানে ২ ও হরিয়ানায় ৪ জন আক্রন্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভারতের রাজ্যে রাজ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে করোনা। কলকাতায় ১১ জন করোনা আক্রান্তের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল এপোলোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬ জন। বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন। পিয়ারলেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশু। এক প্রসূতির আক্রান্তেরও খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মগরাহাটে দুজন আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তরা অধিকাংশই সর্দিজ্বর ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে ভর্তি। সবাইকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।
নয়াদিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. উজ্জ্বল পারাখ জানিয়েছেন, এই ভাইরাস দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে। নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হলেই সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে। তার মতে, করোনার এই প্রকারভেদ প্রতি কয়েক মাস অন্তর রূপ পরিবর্তন করে ফিরে আসবে এবং মাঝে মাঝে সংক্রমণের হার বাড়াবে। কিন্তু এতে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই।
গত শনিবার পর্যন্ত ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে মোট ৩৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩২ জনই বেঙ্গালুরু নগরীর বাসিন্দা। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দিনেশ গুন্ডু রাও সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোভিড ফিরে এসেছে—এমন সংবাদে মানুষ যেন ভয় না পান। গণমাধ্যমকে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার আহ্বান জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্য সরকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট
জানা গেছে, চীনে প্রথম শনাক্ত হয় করোনার এই নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট। সিঙ্গাপুর, হংকংসহ এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি আমেরিকাতেও এর উপস্থিতি চিহ্নিত হয়েছে। দেশে তামিলনাড়ুতে একজন আক্রান্ত NB.1.8.1 প্রজাতির করোনায়। বিশ্বের ২২টি দেশের করোনার এই নতুন প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে জেএন.১ নামে একটি ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে।
সতর্ক হতে হবে বাংলাদেশকে
ভারতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এটা বলা যায় যে, করোনা আমাদের ঘরের পাশে হানা দিয়েছে। ভারত একটি জনবহুল দেশ। বাংলাদেশও একটি জনবহুল দেশ। ভারতের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। রয়েছে তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত দীর্ঘ সীমান্ত। তাই সেখান থেকে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে আমাদের দেশেও। সময় থাকতে তাই আমাদের প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাশের দেশ ভারতে যে হারে করোনার নতুন ধরনটি সংক্রমিত হচ্ছে, তা একটু উদ্বেগের বটে। এই ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে আমরা খুব বেশি তথ্য পাচ্ছি না। তাই বোঝা মুশকিল। আমরা ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছি, আবার আমরা টিকা গ্রহণ করে সেরেও উঠেছি। করোনার কিছু ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে আমাদের রক্তে একটা প্রতিরোধক্ষমতা (ইমিউন সিস্টেম) গড়ে উঠেছে। তাই বলে হাল ছেড়ে বসে থাকলে হবে না। নতুন ধরনের ভ্যারিয়েন্ট হয়তো মারাত্মক হতে পারে।’
এখন সর্দি, কাশিসহ করোনার নানা উপসর্গে আক্রান্ত রোগীদের খুব বেশি নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) পাচ্ছে না বলে জানান অধ্যাপক নজরুল।
তিনি বলেন, ‘এখন খুব বেশি রোগীর নমুনা কিন্তু আমরা পাচ্ছি না। বেশি নমুনা না পেলে আইইডিসিআর কিন্তু ডেটা অ্যানালাইসিস করতে পারবে না।’
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘নমুনা যাই-ই আসুক না কেন, এখন জিনোম সিকোয়েন্সিং করে পরীক্ষা করা উচিত, দেশে কোনো রোগী নতুন ধরনের ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেল কি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের শরীরে যে ভ্যারিয়েন্ট এখন ঘুমন্ত বা নিষ্ক্রিয় রয়েছে, সেটি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্টের সংস্পর্শে। তখন সেই ভ্যারিয়েন্ট অতিরিক্ত শক্তি অর্জন করতে পারে, যা প্রতিরোধের ক্ষমতা হয়তো আমাদের শরীরে নেই। তাই বিষয়টি হেলাফেলা করা যাবে না।’
বাংলাদেশের প্রবীণ দুই রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ খবরের কাগজকে বলেন, এখন থেকে দেশের সব হাসপাতালে বাড়তি সতর্কতা জারি করা উচিত। মৌসুমি কিছু রোগকে একেবারে হেলাফেলা করা যাবে না। সন্দেহভাজন রোগী পেলে তাকে আলাদাভাবে চিকিৎসা করতে হবে। আর বিমানবন্দরেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়াতে বলেছেন তারা।