ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ষষ্ট দিনে গড়াল। কিন্তু ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক স্থাপনাটি এখনো অক্ষত রয়েছে। ইসরায়েল সেটি ধ্বংস করতে চায়। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমা চাচ্ছে তেল আবিব। এটি শুধু বি-২ বোমারু বিমান বহন করতে পারে। ১৪ হাজার কেজির বোমাটি ২০০ ফুট পাথর ভেদ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের হাতে এমন শক্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ফোর্দো ধ্বংস সম্ভব নয়।
গতকাল মঙ্গলবারও ইরান মধ্য ইসরায়েলে হামলা চালায়। এটা ছিল ইসরায়েলি হামলার জবাব। এর আগে ইসরায়েল ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করেছিল। কিন্তু পাহাড়ের গভীরে থাকা ফোর্দো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্টে তারা আঘাত হানতে পারেনি। এই প্ল্যান্ট বিমান হামলা প্রতিরোধের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একমাত্র এমওপি বোমা, যার ওজন ১৪ হাজার কেজি। যেটা ২০০ ফুট পাথর ভেদ করতে পারে- সেই স্থাপনায় ক্ষতি করতে পারে। ইসরায়েলের কাছে এই বোমা নেই। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
এমওপির ডিজাইন ও ক্ষমতা
বোয়িং কোম্পানি এই বোমাটি তৈরি করেছে। এর গায়ে রয়েছে উচ্চশক্তির ইস্পাত খাদ। এটি প্রায় ২ হাজার ৪০০ কেজির শক্তিশালী বিস্ফোরক বহন করে। এতে রয়েছে বিলম্বিত বিস্ফোরণব্যবস্থা, যেটা বোমাকে টার্গেটের গভীরে ঢুকেই বিস্ফোরিত হতে সাহায্য করে। এর ফলে ভেতরের কাঠামো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কাজ করার পদ্ধতি
এমওপি পরিচালিত হয় জিপিএস ও ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম (আইএনএস) দিয়ে। এর মাধ্যমে এটি উচ্চ নির্ভুলতায় টার্গেটের ঠিক কয়েক মিটারের ভেতরে আঘাত হানতে পারে। কঠিন পরিস্থিতিতেও এর দিকভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম। এই বোমা প্রায় ২০০ ফুট (প্রায় ৬০ মিটার) পর্যন্ত শক্ত মাটি ও কংক্রিট ভেদ করতে সক্ষম। পুরোনো অস্ত্রগুলোর তুলনায় এটা বহুগুণ বেশি কার্যকর।
মোতায়েনের পদ্ধতি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্পিরিট স্টিলথ বোমারু বিমানই একমাত্র প্ল্যাটফর্ম, যেটা এই এমওপি বহন ও মোতায়েন করতে পারে। প্রতিটি বি-২ বিমান দুটি এমওপি বোমা নিয়ে উড়তে পারে। ভবিষ্যতে আসছে আরও একটি বিমান ‘বি-২১ রেইডার’। এটা এখনো নির্মাণাধীন। ভবিষ্যতের মিশনে এই বোমা বহনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
উন্নয়ন ও পরীক্ষা
২০০০ সালের গোড়ার দিকে লকহিড মার্টিন ও নর্থরপ গ্রুম্যান প্রথম এই বোমা তৈরির উদ্যোগ নেয়। আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে প্রকল্পটি বন্ধ হয়। পরে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় দেখা যায়, প্রচলিত বাঙ্কার-বোমাগুলো পর্যাপ্ত কার্যকর নয়। তখন আবার প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত হয়।
২০০৪ সালে শুরু হয় প্রাথমিক পরীক্ষা। ২০০৭ সালে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস রেঞ্জে প্রথম বিস্ফোরণের পরীক্ষা হয়। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বি-৫২ ও বি-২ বিমান থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই বোমা ফেলা হয়। সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।
২০১১ সালে এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়। পরের বছর পাঁচটি অস্ত্র ফেলা হয়- তিনটি জীবন্ত ও দুটি নিষ্ক্রিয়। সবগুলোই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। ওই বছর পেন্টাগনের এক গোপন প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এমওপি কার্যকর। এটি এখন কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আছে। কোনো বিদেশি বাহিনী এই অস্ত্র ব্যবহার করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা লাগবে।
ইসরায়েল ইরানের ফোর্দো পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে না?
কয়েকদিন ধরে ইসরায়েল ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে অন্তত একটি জায়গা এখনো অক্ষত রয়েছে। সেটি হলো ফোর্দো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট। পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত এই স্থাপনাটি বিমান হামলা ঠেকানোর মতো করে তৈরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ধ্বংস করতে পারবে না ইসরায়েল। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই পক্ষেই সম্ভব। ইসরায়েল অতীতে গোপন অভিযান এবং টার্গেট হামলার মাধ্যমে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে চমকে দিয়েছে। তবুও, নিউ ইয়র্ক পোস্ট বলছে, ‘ফোর্দোর প্রতিরক্ষা ভাঙার মতো অস্ত্র ইসরায়েলের হাতে আছে, এমন প্রমাণ নেই।’
ফোর্দো কী?
ফোর্দো হলো ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর একটি। এটি কোম শহর থেকে ৩০ কিলোমিটারের বেশি। তেহরান থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে ফোর্দো গ্রামের কাছে একটি পাহাড়ের নিচে অবস্থিত। আগে এটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির অংশ ছিল।
গোপনে নির্মাণ
২০০০ সালের গোড়ায় ইরান গোপন ‘আমাদ পরিকল্পনা’র আওতায় ফোর্দো নির্মাণ শুরু করে। লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি। এটি বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়িয়ে গোপন ছিল। ২০০৯ সালে পশ্চিমা গোয়েন্দারা এটি আবিষ্কার করলে ইরান আইএইএর কাছে এটি প্রকাশ করে। তখন বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়।
ফোর্দোকে ধ্বংস করা কঠিন কেন?
ফোর্দো মাটির ৮০ থেকে ৩০০ ফুট গভীরে। ফলে সাধারণ বোমা বা ইসরায়েলি উন্নত অস্ত্র দিয়েও এটি ধ্বংস করা যায় না। এতে প্রায় ৩ হাজার আইআর-১ সেন্ট্রিফিউজ বসানো হয়েছিল, যেটা দুটি অংশে বিভক্ত। এখন এটি রাশিয়ার এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমে সুরক্ষিত। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের গবেষক নিকোলাস কার্ল বলেন, ‘তেহরান নিশ্চিত করেছে, এই স্থাপনাটি বিমান হামলা থেকে বাঁচবে। অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুর তুলনায় এটি অনেক বেশি কঠিন।’
পারমাণবিক কর্মসূচিতে ফোর্দোর ভূমিকা
২০১৫ সালের জেসিপিওএ চুক্তিতে ফোর্দোর সামরিক ব্যবহার বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ গবেষণার কাজে লাগানোর কথা ছিল। কিছুদিন তা বন্ধও ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে ইরান ফের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে।
বর্তমানে সেখানে প্রায় ২ হাজার সেন্ট্রিফিউজ চালু রয়েছে। এর মধ্যে উন্নত আইআর-৬ মডেলও আছে। এগুলো ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে। যেটা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের খুব কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোর্দো প্রতি তিন মাসে ১৬৬ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করে। এ থেকে চারটি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। যদিও ইরানের অন্য পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে, ফোর্দো এখনো অক্ষত।
ওয়াশিংটন পোস্টের বরাত দিয়ে কেলসি ডেভেনপোর্ট বলেন, ‘ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ফোর্দোর মতো স্থাপনাকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।’ সূত্র: এনডিটিভি