যুদ্ধের নবম দিনে ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ চালিয়েছে। গতকাল শনিবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের কেন্দ্রস্থল ইস্ফাহান এলাকার পরমাণু চুল্লি এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় খোরামাবাদ শহরে বিমান হামলা চালায়। হামলায় দুই ইরানি কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল।
ইরান এর জবাব দেয় ড্রোন হামলা চালিয়ে। এক ডজনের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরানি সেনাবাহিনী। তবে আইডিএফ জানিয়েছে, গতকাল সকালে আটটি ইরানি ড্রোন ইসরায়েলের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে ইরানের দুটি ড্রোন গতকাল দেশটির উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে।
সংবাদদাতারা বলছেন, ইরানের এই ড্রোন আক্রমণ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে বিস্মিত করেছে। হামলার বিষয়টি স্বীকার করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এটি একটি বিরল ঘটনা। ইরানের একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন সফলভাবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইসরায়েলে। তবে এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গত শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জেনেভা আলোচনায় অংশ নিলেও তাতে কোনো সমাধান মেলেনি। বৈঠকের পর ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, আগ্রাসন বন্ধ না হলে তারা নতুন পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনায় বসবে না। আব্বাস আরাগচি শুক্রবার জেনেভায় ইউরোপীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা আরাগচিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘হামলা বন্ধ হলে এবং আগ্রাসনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি করানো হলে ইরান আবার কূটনৈতিক পথটি বিবেচনা করে দেখতে প্রস্তুত রয়েছে।’
ইরানি গণমাধ্যম স্বীকার করেছে যে দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় আহত আরও একজন পরমাণু বিজ্ঞানী মারা গেছেন। এ নিয়ে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে। সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানে হামলা চালালে লোহিত সাগরে ভাসমান আমেরিকান জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা।
ইস্ফাহানে ইসরায়েলের হামলা
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গতকাল শনিবার ভোরে ইরানের কেন্দ্রস্থল ইস্ফাহানে একটি পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। হামলায় লেনজান, মোবারাকে ও শাহরেজা এলাকার পাশাপাশি ইস্ফাহানের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু স্থাপনাতেও আঘাত হানে ইসরায়েল। এক ডজনের বেশি লক্ষবস্তুতে আঘাত হানে তারা। এএফপি ও আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় খোরামাবাদ শহরে ইসরায়েলি হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরানের মেহের সংবাদ সংস্থাও গতকাল সকালে জানিয়েছে, মধ্য ইরানের কোমে ইসরায়েলি হামলায় দুজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। আনাদোলুর খবরে বলা হয়, এ হামলায় কেউ হতাহত হননি এবং পরমাণু স্থাপনা সুরক্ষিত রয়েছে।
ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইস্ফাহানে হামলায় কোনো ক্ষতিকর পদার্থ ছড়িয়ে পড়েনি, যদিও জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থা আইএইএ এখনো এই স্থাপনা সম্পর্কে কোনো হালনাগাদ তথ্য দেয়নি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা রাতভর ইরানের মধ্যাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম ও অবকাঠামোর ওপর ‘একাধিক হামলা’ চালিয়েছে। আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহর এবং মাহশাহর বন্দরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাব দিয়েছে। তারা শুক্রবার রাতভর ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইসরায়েলে। সংবাদদাতারা বলছেন, ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সেখানে গোলার টুকরা পড়ে একটি ভবনে আগুন ধরে গেছে।
আইআরজিসির দুই শীর্ষ কমান্ডার নিহত
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আইআরজিসির দুই শীর্ষ কমান্ডারের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল এমনটিই দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। তার ভাষ্যমতে, ইরানের একটি বহুতলে হামলা চালানো হয়েছে। তাতে মৃত্যু হয়েছে আইআরজিসি কমান্ডার সাইদ ইজাদির। এ ছাড়া গভীর রাতে আইআরজিসির আরও এক কমান্ডার বেনহ্যাম শরিয়ারির গাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। তারও মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কাৎজকে উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। ইরানের তরফে সরকারিভাবে এই হামলা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
আগ্রাসন বন্ধ হলেই আলোচনা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইসরায়েলের ‘আগ্রাসন বন্ধ হলেই’ কেবল ইরান কূটনীতির কথা বিবেচনা করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং ইসরায়েলের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ইরান ‘আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার’ চর্চার ধারা অব্যাহত রাখবে। তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলছি, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কোনো আলোচনার বিষয় নয়।’ শুক্রবার জেনেভায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আলোচনা চললেও কোনো বড় সাফল্য পাওয়া যায়নি। তবে ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, ইরান এখন আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী এবং এমন কিছু বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি, যেগুলো আগে আলোচনায় ছিল না। তারা সবাই জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফিরতে হবে।
ইরান ইউরোপের সঙ্গে কথা বলতে চায় না: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা এড়াতে ইরানের ‘সর্বোচ্চ’ দুই সপ্তাহ সময় রয়েছে। বৃহস্পতিবার ঘোষিত ১৪ দিনের এই সময়সীমার আগেও তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের নির্দিষ্ট সময় দিচ্ছি এবং বলতে চাই দুই সপ্তাহ হবে সর্বোচ্চ। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের বোধোদয় হয় কি না তা দেখা।’ তবে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আলোচনাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শুক্রবার রাতে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরান ইউরোপের সঙ্গে কথা বলতে চায় না। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়। ইউরোপ এতে সহায়তা করতে পারবে না।’
মাখোঁকে ফোন পেজেশকিয়ানের
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, তিনি তার ইরানি প্রতিপক্ষ মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছ থেকে একটি ফোন পেয়েছেন এবং তারা ইউরোপীয় শক্তি ও ইরানের মধ্যে তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে সম্মত হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি দাবি করছি: ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না এবং তার উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ, এই নিশ্চয়তা প্রদান করা তার ওপর নির্ভর করে।’
ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে শুরু
ইরানে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে তুরস্কে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলি সরকারই সবচেয়ে বড় বাধা। এই অঞ্চল ও পুরো বিশ্বকে একটি বড় বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া ছাড়া নেতানিয়াহুর জায়নবাদী আকাঙ্ক্ষার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের নতুন করে আলোচনার আগে ইসরায়েল যে হামলা চালাচ্ছে তার লক্ষ্য হলো ওই আলোচনা বানচাল করে দেওয়া। বৈঠকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলা এই অঞ্চলকে ‘সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিশ্বশক্তিগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মোসাদ সংশ্লিষ্টতায় ইরানে ৫৪ জন গ্রেপ্তার
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলু জানিয়েছে, খুজেস্তান প্রদেশের প্রসিকিউটর অফিস শুক্রবার এ তথ্য দিয়েছে।ফার্সের খবরে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষকে সমর্থন, তাদের হয়ে তথ্য সংগ্রহ, খামেনি শাসনের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচারে ‘জড়িত’ থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইরানের আরেক পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত
ইরানের পারমাণবিক শিল্পের আরেক বিজ্ঞানী ড. সাইয়েদ এসার তাবাতাবাই কোমশেহ গত সপ্তাহের শেষের দিকে তার স্ত্রী মানসুরেহ হাজি সালেমসহ তাদের বাড়িতে হামলায় নিহত হয়েছেন। ইরানি সংবাদ সংস্থা মেহর শরিফের বরাত দিয়ে এ খবর দেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসির কমান্ডার নিহত: ইসরায়েল
ইসরায়েলের গত শুক্রবারের হামলায় আইআরজিসির এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার মারা গেছেন। তাদের ভাষ্য, নিহত আমিন পোর জোদাখি আইআরজিসির দ্বিতীয় ইউএভি (ড্রোন) ব্রিগেডের দায়িত্বে ছিলেন। ইসরায়েল আক্রমণ শুরু করার পর জোদাখি শীর্ষ পর্যায়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন। সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো কোম এলাকায় কুদস বাহিনীর ফিলিস্তিনি কোরের কমান্ডার এবং ইরানি সরকার ও হামাসের মধ্যে মূল সমন্বয়কারী সাঈদ ইজাদিকে হত্যা করেছে।
পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলি-ইরানি সংকটের মধ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের রাষ্ট্রদূতরা তাদের দেশের কাছাকাছি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসির কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভিয়েনায় এক বৈঠকে রাষ্ট্রদূতরা গ্রোসিকে পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করার ‘বিপজ্জনক পরিণতি’ সম্পর্কে সতর্ক করেন।
ইরানে নিহত ৪৩০ জন
গত ১৩ জুন ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে কমপক্ষে ৪৩০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে স্থানীয় নূর সংবাদ সংস্থা। কয়েক দিনের মধ্যে ইরানে মৃতের সংখ্যা সম্পর্কে এটি প্রথম সরকারি ভাষ্য। তবে মানবাধিকার গোষ্ঠী হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি গত শুক্রবার ৬৫৭ জন নিহতের তথ্য জানায়। ইসরায়েল দাবি করেছে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে ২৫ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে একজন হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। আহত হয়েছেন ২ হাজার ৫১৭ জন। তথ্যসূত্র: বিবিসি/ডন/রয়টার্স।