কাতারে ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেঙে পড়ার মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের এক কর্মকর্তা। তিনি ওই আলোচনার বিস্তারিত সম্পর্কে অবহিত।
ওই সূত্রের দেওয়া তথ্যানুসারে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন সফরের অজুহাতে সময় নষ্ট করেছেন। তিনি দোহায় এমন একটি দল পাঠিয়েছেন, যাদের আসলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কোনো ক্ষমতা ছিল না। ফলে গাজায় সহায়তা প্রবেশ ও মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে একমত হতে পারেনি দুই পক্ষ।
নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার (10জুলাই) ওয়াশিংটন থেকে ফেরার আগে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো যুদ্ধবিরতি হবে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে হামাসকে ১০ জীবিত ইসরায়েলি জিম্মি মুক্তি দিতে হবে। রবিবার থেকেই এ বিষয়ে ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। কিন্তু (১৩জুলাই) শুক্রবার রাতে আলোচনা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। কারণ দুই পক্ষই বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক ইস্যু নিয়ে একমত হতে পারেননি।
মূলত গাজায় কীভাবে মানবিক সহায়তা সরবরাহ করা হবে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর গাজা থেকে সরে আসার বিষয়টি কতটা বড়মাপের হবে– এ দুই ইস্যু নিয়েই সাম্প্রতিক সময়ে বেশি আলোচনা হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে।
হামাস জানিয়েছে, গাজায় মানবিক সহায়তা অবশ্যই জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রবেশ করতে হবে। অন্যদিকে ইসরায়েল গাজায় হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) মাধ্যমে ত্রাণ দেওয়ার পক্ষে। বিতর্কিত এই সহায়তা সংস্থা থেকে ত্রাণ আনতে গিয়ে মে মাসের শেষ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮০০ মানুষ ইসরায়েলি গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার ইস্যুতে হামাস চায়, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী একেবারেই সরে যাক। অন্যদিকে ইসরায়েল চায়, গাজার এক থেকে দেড় কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত একটি বাফার অঞ্চল তৈরি করতে। এ দুই ইস্যু নিয়েই যত মতানৈক্য।
হামাস শুরুতে ইসরায়েলের বাফার জোনের দাবি কিছুটা মেনে নিলেও কোন কোন স্থান থেকে তারা সেনা সরিয়ে নেবে, সেটির একটি মানচিত্র চেয়েছে। ইসরায়েল মানচিত্র দেওয়ার পরই বাঁধে বিপত্তি। তারা যতটুকু মুখে বলেছিল, আর মানচিত্রে যা আছে– দুটোর মধ্যে বিস্তর ফারাক। মানচিত্রে বাফার জোন আছে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত। এতে দেখা গেছে, রাফার পুরোটা, খান ইউনিসের খুজা গ্রামের ৮৫ শতাংশ, বেইত লাহিয়া ও বেইত হানোনের উল্লেখযোগ্য অংশ, গাজা সিটির পূর্বের বেশকিছু অংশজুড়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী থাকবে।
বিষয়টিকে মোটেও ভালোভাবে নেয়নি হামাস। এতে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার আরও অবনতি হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলি প্রতিনিধি দল ইচ্ছা করে পুরো বিষয়টিকে বিলম্বিত করছেন। জ্যেষ্ঠ এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বলেন, তারা কখনো আলোচনার বিষয়ে গুরুত্বই দেয়নি। তারা এগুলোর অজুহাতে সময় নষ্ট করেছে এবং ভান ধরেছে যে অগ্রগতি হচ্ছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেছেন যে ইসরায়েল মানবিক পরিকল্পনার আড়ালে জোর করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এরই মধ্যে রাফায় মানবিক শহর গড়ার পরিকল্পনা জানিয়েছেন। তাদেরকে মূলত সেখানে মিসর সীমান্তের কাছে নেওয়া হবে পরে জোর করে রাফা সীমান্ত বা সমুদ্রপথে বের করে দেওয়ার জন্য।
কাৎজ ছয় লাখ ফিলিস্তিনিকে তার ওই মানবিক শহরে রাখতে চাইছেন। তারা সেখানে একবার প্রবেশের পর আর বের হওয়ার অনুমতি পাবেন না বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরেও সমালোচনা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। মানবাধিকার গোষ্ঠী, শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীরা বলছেন, এটি মূলত ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের’ নীলনকশা।
আলোচনার এ ভঙ্গুর দশায় ফিলিস্তিনি ওই কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। একই কথা বলছেন মধ্যস্থতাকারীরাও। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এটি করা না হলে দোহার আলোচনা ব্যর্থ হতে পারে। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলছেন, সবকিছু সুতায় ঝুলছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৫৭ হাজার ৮২৩ জন মারা গেছেন। নিহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলাকালেও হামলা থামায়নি ইসরায়েল। উল্টো বাড়িয়েছে। ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর প্রতিদিনই দফায় দফায় আক্রমণ চালাচ্ছে তারা। সূত্র: বিবিসি