তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়ে। সম্ভাব্য চীনের সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে দ্বীপটি এদিন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বেসামরিক প্রতিরক্ষা মহড়ার আয়োজন করে।
এ সময় রাজধানী তাইপে জুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে এবং কিছু এলাকায় বাসিন্দারা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে শুরু করে। তাছাড়া যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া, শহরটিতে গণ-উদ্ধার মহড়া এবং গণ-হত্যা ইভেন্টের মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়।
তাইওয়ানের সর্ববৃহৎ বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘হান কুয়াং’ মহড়ার অংশ হিসেবে পরিচালিত এই অভিযানে চীনের আগ্রাসন বা অনুপ্রবেশ শুরু হলে কী করতে হবে, সেসব অনুশীলন করেছে দেশটির নাগরিকরা। সম্প্রতি দ্বীপ রাষ্ট্রটি তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বেশ জোরদার করছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মহড়ার অংশ হিসেবে শহর এলাকায় বিমান হামলার সতর্কতা সংকেত বাজানো হয়। তখন, বাসিন্দারা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেন এবং স্থলভাগে চলমান গাড়িও থামিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া, শহর দ্রুত কীভাবে ফাঁকা করতে হবে, সেটিও অনুশীলন করানো হয় নাগরিকদেরকে।
গত বছর তাইওয়ানে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে চীন-তাইওয়ানের পুরনো উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। চীন উইলিয়াম লাইকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে আখযায়িত করে। বৃহস্পতিবারের এই মহড়ায় অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে লাইও অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া,আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ তাইওয়ানের প্রধান রেমন্ড গ্রিনও এতে অংশ নেন। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অফ তাইওয়ান সেখানে ডে ফ্যাক্টো দূতাবাস হিসেবে পরিচিত।
গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রতিদিনই বিভিন্ন শহরে অধাঘণ্টা করে বিমান হামলার সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয়েছে। নির্ধারিত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের ঘরে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে, অন্যথায় জরিমানা করা হয়। দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট বন্ধ রেখে সব যানবাহন থামিয়ে চালকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়।
তাইপে শহরে স্কুল, মন্দির, সাবওয়ে স্টেশন ও মহাসড়ক থেকে গণহারে উচ্ছেদ করা হয়। একটি কৃত্রিম গণহত্যা পরিস্থিতির চর্চাও করা হয়। আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা, জরুরি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন সহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চলছে। এই মহড়া নিয়ে তাইওয়ানে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছেন।
তবে, তাইওয়ানের নাগরিকদের বড় একটি অংশ এ সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় পোষণ করেন। তাইওয়ানের সরকারঘনিষ্ঠ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইএনডিএসআর)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি নাগরিক মনে করেন আগামী পাঁচ বছরে চীন হামলা চালাবে না।
তাইওয়ান এবং চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব মূলত তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে, যেখানে চীন তাইওয়ানকে নিজেদের একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে। এই দ্বন্দ্ব কয়েক দশক ধরে চলে আসছে এবং এর মূলে রয়েছে চীনা গৃহযুদ্ধ ও তাইওয়ানের রাজনৈতিক ইতিহাস।
তাইওয়ান ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্বের মূল বিষয়গুলো হলো:
তাইওয়ান দ্বীপটি চীন থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। চীন তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং এটিকে মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করতে চায়।
১৯৪৯ সালে চীনা গৃহযুদ্ধের পর চীন প্রজাতন্ত্র (ROC), যারা তাইওয়ানে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এরপর থেকে চীন (গণপ্রজাতন্ত্রী চীন বা PRC) তাইওয়ানকে তাদের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।
তাছাড়া, চীন ‘এক চীন’ নীতিতে অটল, যার অর্থ হল বিশ্বে কেবল একটি চীন থাকবে এবং তাইওয়ান তার অংশ। তবে তাইওয়ান নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের নিজস্ব সরকার ও সামরিক বাহিনী রয়েছে।
অন্যদিকে, তাইওয়ানকে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে, অনেক দেশ চীনের ‘এক চীন’ নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয় না।
এসব বিরোধ নিয়ে চীন প্রায়ই তাইওয়ানের আকাশসীমায় সামরিক মহড়া চালায়, যা তাইওয়ান ও তাদের মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এই দ্বন্দ্বের কারণে তাইওয়ান সবসময়ই চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসনের ঝুঁকিতে থাকে এবং তাইওয়ানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সুলতানা দিনা/