ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর কমান্ড সেন্টারের ক্লাউড স্টোরেজ ও এআই পরিষেবা সীমিত করে দিয়েছে মাইক্রোসফট। ক্লাউড কম্পিউটিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে লাখ লাখ বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারির অভিযোগে এই উদ্যোগ নিয়েছে মাইক্রোসফট।
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক ব্লগ পোস্টে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে মার্কিন টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস চেয়ার ব্র্যাড স্মিথ।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পোস্টে ব্র্যাড স্মিথ লিখেন, গত ৬ আগস্ট দ্য গার্ডিয়ান, +972 ম্যাগাজিন এবং হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কলের যৌথ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা তথ্যের প্রেক্ষিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি ইউনিটের জন্য কিছু পরিষেবা (ক্লাউড স্টোরেজ ও এআই পরিষেবা) বন্ধ ও ডিস্যাবল করেছে মাইক্রোসফট।
ওই ব্লগ পোস্টে স্মিথ আরও লিখেন, ‘প্রথমত, আমরা সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপক নজরদারির জন্য কোনো প্রযুক্তি সরবরাহ করি না। এই নীতি আমরা বিশ্বের প্রতিটি দেশে মেনে চলি এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বারবার এ বিষয়ে জোর দিয়েছি। দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের গ্রাহকদের গোপনীয়তার অধিকারকে সম্মান করি এবং সুরক্ষিত রাখি।’
নির্দিষ্ট একটি ইউনিটের জন্য এসব পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছে উল্লেখ করলেও কোন ইউনিট তা স্পষ্ট করেননি স্মিথ।
দ্য গার্ডিয়ান, +972 ম্যাগাজিন ও লোকাল কলের অনুসন্ধানে উঠে আসে, গাজা ও পশ্চিম তীরের বাসিন্দাদের ফোন কলের ড্যাটা মাইক্রোসফটের এজেডইউআরই ক্লাউড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ইউনিট-৮২০০।
ইউনিট-৮২০০ হচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ সাইবার ওয়ারফেয়ার ইউনিট, যা গোপন অপারেশন পরিচালনার পাশাপাশি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ এবং নজরদারির কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
ওই অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ২০২১ সালে মাইক্রোফটের সিইও সত্য নাদেলা এবং ইউনিট-৮২০০ এর নেতা ইয়োসি সারিয়েলের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। ওই সমঝোতায় সিদ্ধান্ত হয়, ইউনিট-৮২০০কে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সংরক্ষণে সহযোগিতা করবে মাইক্রোসফট। ২০২২ সালে কার্যকর হয় ওই চুক্তি।
পরে, ২০২২ থেকেই মাইক্রোসফটের অসীম স্টোরেজ ও কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনির ফোন কল সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে ইসরায়েল।
ক্লাউডভিত্তিক ওই পরিষেবা ইসরায়েলকে অবরুদ্ধ গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রাণঘাতী হামলা চালাতেও সহায়তা করেছে। ইউনিট-৮২০০ এরই এক সূত্র তা নিশ্চিত করেছে।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, নেদারল্যান্ডস এবং আয়ারল্যান্ডে অবস্থিত এজেডইউআরই-এর সার্ভারগুলোতে ফিলিস্তিনিদের ড্যাটার বড় অংশ সংরক্ষিত রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে হামাস ইসরায়েলে হামলা করার পর এবং গাজার যুদ্ধ শুরু হলে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মাইক্রোসফটের পণ্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইসরায়েলি সেনারা ক্লাউডে গিগাবাইট পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক ভাষা অনুবাদ পরিষেবা ব্যবহার করে ব্যাপক নজরদারি চালাচ্ছে, যা এআই সিস্টেমের সঙ্গে মিলিয়ে বিমান হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে কাজে লাগানো হচ্ছে।
এদিকে, চলতি বছরের মে মাসে মাইক্রোসফট স্বীকার করে যে, গাজার যুদ্ধে তারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য উন্নত এআই এবং ক্লাউড কম্পিউটিং পরিষেবা সরবরাহ করেছে এবং অবরুদ্ধ অঞ্চলে ইসরায়েলি বন্দীদের খুঁজে বের করতে সহায়তা করেছে।
তবে সংস্থাটি দাবি করেছে, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার পর তারা ‘কোনো প্রমাণ’ পায়নি যে, এজেডইউআরই ব্যবহার করে মানুষকে টার্গেট বা ক্ষতি করা হয়েছে।
গত আগস্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরে, মাইক্রোসফট একটি দ্বিতীয় পর্যালোচনা শুরু করে, যা বাইরে থেকে একটি আইন সংস্থা পরিচালনা করছে। সেই পর্যালোচনা বর্তমানে চলমান।
তবে ভাইস চেয়ারম্যান ব্র্যাড স্মিথ স্বীকার করেন যে, ইতোমধ্যেই প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, তাদের পণ্য এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যা কোম্পানির পরিষেবা শর্ত লঙ্ঘন করছে।
সুলতানা দিনা/