গাজায় চলমান আগ্রাসন ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বমঞ্চে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে ইসরায়েল। এর প্রভাব শুধু কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বিনোদন ও খেলাধুলার অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গাজা সিটিতে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন এবং কাতারের মাটিতে হামাস নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়ে উঠেছে। রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলের একঘরে হয়ে পড়ার বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়।
এদিকে ইসরায়েলি হামলায় গতকাল গাজায় শিশুসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানায়। এর ফলে ইসরায়েলের টানা আগ্রাসনে গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৬ হাজার ৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৬২ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৭ জন নিহত এবং ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা
সম্প্রতি জাতিসংঘের এক স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েল যে আগ্রাসন চালিয়েছে, তা গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে। এই অবস্থায় ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আংশিক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডসসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি, বসতি স্থাপনকারী ও সহিংস কর্মকাণ্ডের সমর্থনকারী সংগঠনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল হিসেবে খ্যাত নরওয়ের সার্বভৌম তহবিল গত আগস্টে ইসরায়েলি কোম্পানিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়। এ ছাড়া ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং অন্যান্য দেশ ইসরায়েলের ওপর আংশিক বা পূর্ণ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এ অবস্থায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেছেন, দেশটি এখন ‘এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার’ মুখোমুখি রয়েছে। এই বিচ্ছিন্নতা বহু বছর ধরে চলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ইসরায়েলের অস্ত্রশিল্পকে আরও বিকশিত করতে হবে এবং দেশের অর্থনীতিকে এমনভাবে গড়তে হবে, যাতে বাইরের বাণিজ্যের ওপর নির্ভরতা কমে। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, তার মন্তব্য কেবল প্রতিরক্ষা খাত সম্পর্কিত ছিল।
সংস্কৃতি ও বিনোদনক্ষেত্রে বয়কট
সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনেও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ইউরোভিশন গানে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ থাকলে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্পেন অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়েছে। আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আরটিই জানায়, গাজায় যে হারে সাধারণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটে তাদের অংশগ্রহণ ‘অনৈতিক’ হবে। সম্প্রতি বেলজিয়ামের ঘেন্ট শহরের একটি সংগীত উৎসব (কনসার্ট) বাতিল করে জার্মানির মিউনিখ ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা। কারণ ওই অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টর লাহাভ শানি ইসরায়েলি এবং তার অবস্থান ‘ইসরায়েলি সরকারের গণহত্যামূলক নীতির’ বিরুদ্ধে স্পষ্ট নয় বলে তারা উল্লেখ করেছে।
হলিউডেও ইসরায়েলের বিরোধিতা তীব্র হচ্ছে। বহু চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা ও প্রযোজক ইসরায়েলি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ না করার অঙ্গীকার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন অলিভিয়া কলম্যান, এমা স্টোন, অ্যান্ড্রু গারফিল্ডসহ অনেকে। অভিনেত্রী হান্না ইনবাইন্ডার তার এমি পুরস্কারপ্রাপ্তির সময় বক্তৃতার শেষে বলেন, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন।’
স্পেনের জনপ্রিয় সাইক্লিং রেস ‘লা ভুয়েল্তা’র শেষ ধাপ বাতিল করা হয়। কারণ ওই রেসে ইসরায়েল-প্রীমিয়ার টেক দলের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়। এ ছাড়া স্পেনেই একটি দাবা প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের তাদের জাতীয় পতাকা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর তারা প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান।
ইউরোপীয় ফুটবলেও ইসরায়েলের অবস্থান এখন অনিশ্চিত। ইউইএফএর এক ম্যাচে ‘শিশু হত্যা বন্ধ করো’ লেখা ব্যানার মাঠে প্রদর্শিত হলে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ ছাড়া অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়, যেমন লিভারপুল তারকা মোহাম্মদ সালাহ গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
বহু বিশ্লেষক বলছেন, ইসরায়েলের এই বিচ্ছিন্নতা দক্ষিণ ইসরায়েলে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। অনেকের মনে এখন ওই সময়ের কথা ঘুরেফিরে আসছে। তখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বয়কটের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারকে মাথা নত করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার মতোই আজ ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে বয়কট শুরু হয়েছে।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ দেশ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন হ্রাস পেয়েছে। কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোও এখন ভোটদানে বিরত থাকছে বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলের পাশে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “আমরা ইসরায়েলের কিছু কার্যক্রমে অখুশি হলেও, সম্পর্ক অটুট থাকবে।”
এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে নেতানিয়াহুর চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি ফ্রান্স ও স্পেনের আকাশসীমা এড়িয়ে নিউ ইয়র্ক যান, যাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঝুঁকি না থাকে।