গাজা সিটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো ঘরে ফেরার যাত্রা শুরু করেছে। এদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে শুক্রবার দুপুর ১২টা (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) থেকে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নতুন অবস্থান-রেখায় সেনা মোতায়েন সম্পন্ন করেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের বাহিনী সেখানে অবস্থান করবে এবং যেকোনো তাৎক্ষণিক হুমকি প্রতিহত করতে পদক্ষেপ নেবে। দুই বছর তিন দিনের যুদ্ধ শেষে এখন গাজার ৫৮ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে এবং যুদ্ধবিরতির আওতায় বন্দি বিনিময়ের ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শুরু হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই হাজার হাজার ফিলিস্তিনি উত্তর গাজার দিকে দীর্ঘ ও কষ্টকর পথ পাড়ি দিচ্ছেন। তবে শুক্রবারই যুদ্ধবিরতির আগে ইসরায়েল গাজা সিটির পূর্বদিকে হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালায় এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস এলাকায় বিমান ও গোলাবর্ষণ করে বলে আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে।
গাজার আল-আহলি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত সাতজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খান ইউনিসে হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও সেখানে ভারী ট্যাংক গোলাবর্ষণ চলেছে।
এই হামলাগুলো ইসরায়েল সরকারের বৃহস্পতিবার রাতে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ অনুমোদনের পর প্রথমবারের মতো গাজায় ঘটল। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা ইতোমধ্যে গাজা চুক্তির নির্ধারিত সীমারেখার পেছনে সরে যেতে শুরু করেছে।
সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা জানায়, যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ভোর থেকেই গাজা আকাশে ইসরায়েলি ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও নৌযানের তৎপরতা দেখা গেছে। বহু পরিবার উত্তরের পথে রওনা দিয়েছে, তবে তারা এখনো নেতজারিম করিডর এলাকায় অপেক্ষায় আছে, যেখানে ইসরায়েলি সেনারা আগে অবস্থান করত। তারা শেষ ট্যাংকটি এলাকা ছাড়ার অপেক্ষায় আছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ মানুষকে সতর্ক করেছে যেন তারা গাজা সিটির সীমান্ত এলাকাগুলোতে না যায়, যতক্ষণ না ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নিশ্চিত হয়।
গাজার পুলিশ জানিয়েছে, তারা নাগরিকদের সহায়তা, জননিরাপত্তা এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পদের সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে। পুলিশ জনগণকে অনুরোধ করেছে ফিরে আসার সময় ‘সন্দেহজনক বস্তু, বিপজ্জনক বর্জ্য ও অবিস্ফোরিত বোমা’ থেকে সাবধান থাকতে।
ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের প্রধান আমজাদ শাওয়া বলেন, “মানুষ তাদের জমিতে ফিরে এসে নিজেদের অধিকার আদায় করছে, যা প্রমাণ করে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি জানান, তাদের সংগঠন জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ফেরত আসা নাগরিকদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এর আগে ইসরায়েল সরকার যুদ্ধবিরতির “প্রথম ধাপ” অনুমোদন করে, যার আওতায় বন্দি বিনিময় ও গাজার কিছু অংশ থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। তবে এটি স্থায়ী শান্তির পথে কতটা অগ্রগতি আনবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
হামাসের প্রধান আলোচক খালিল আল-হাইয়া জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে তারা নিশ্চয়তা পেয়েছেন যে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর মানেই “গাজার যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে শেষ”।
ইসরায়েল সরকারের অনুমোদিত এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লড়াই বন্ধ হওয়ার কথা, আর হামাসকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্দি বিনিময় সম্পন্ন করতে হবে।
এদিকে, ফিলিস্তিনের কুদস নিউজ নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, মিসরে আশ্রয় নেওয়া গাজার বাসিন্দারা অক্টোবর ৭, ২০২৩-এর পর প্রথমবারের মতো রাফাহ সীমান্তপথে ঘরে ফেরার অনুমতি পেয়েছেন। একইসঙ্গে গাজা থেকে মিসরে যাতায়াতও চালু হবে।
চুক্তির অংশ হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করবে এবং দক্ষিণ থেকে উত্তর পর্যন্ত সালাহউদ্দিন ও রাশিদ সড়ক দিয়ে চলাচল অবাধ থাকবে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/