বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকট ঘিরে চলমান বিক্ষোভে গুলি চালানোর নির্দেশ অমান্য করে রাস্তায় নেমেছে মাদাগাস্কারের সেনারা।
শনিবার (১১ অক্টোবর) রাজধানী আন্তানানারিভোতে হাজারো মানুষের বিক্ষোভে যোগ দেন কয়েকদফা সেনা সদস্য। তারা ঘোষণা দেন— বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো অবস্থাতেই গুলি চালাবেন না।
সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ থেকে শুরু হওয়া তরুণপ্রজন্মের ‘জেন-জেড’ নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন শনিবার নতুন করে ব্যাপক আকার নেয়। আন্তানানারিভোর আনোসি হ্রদ এলাকায় যখন পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গের চেষ্টা করছিল, তখন সেনারা সেখানে এসে জনতার পাশে দাঁড়ান। উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা উল্লাসধ্বনি ও করতালিতে সেনাদের স্বাগত জানান।
এর আগে শহরের উপকণ্ঠের সোয়ানিরানা সামরিক ঘাঁটিতে এক বৈঠকে সেনারা ঘোষণা দেন, তারা আর বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে সৈন্যদের বলতে শোনা যায়— “সেনা, জেন্ডারম ও পুলিশ সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন। আমাদের ভাই-বোনদের ওপর গুলি চালানোর জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করব না।”
তারা বিমানবন্দরের সেনাদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, “সব উড়োজাহাজ উড্ডয়ন বন্ধ করুন, গেট বন্ধ রাখুন এবং আমাদের পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করুন। যারা আপনাদের বন্ধুদের ওপর গুলি চালাতে বলবে, তাদের দিকেই অস্ত্র তাক করুন।”
শনিবারের এই বিক্ষোভ ছিল সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড়। বিদ্যুৎ ও পানির সংকট থেকে শুরু হওয়া এই তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এখন রূপ নিয়েছে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে। তবে ঠিক কতজন সেনা এতে যোগ দিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।
২০০৯ সালে সোয়ানিরানার এই একই ঘাঁটি থেকেই এক বিদ্রোহের সূচনা হয়, যা শেষ পর্যন্ত বর্তমান প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনাকে ক্ষমতায় আনে।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল দেরামাসিঞ্জাকা মানানৎসোয়া রাকোতোআরিভেলো সেনাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমাদের যারা একমত নন, তাদের সংলাপকে অগ্রাধিকার দিতে অনুরোধ জানাই। মাদাগাস্কারের সেনাবাহিনী জাতির মধ্যস্থতাকারী ও শেষ প্রতিরক্ষার প্রাচীর।”
এর আগে বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বাহিনীর টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন অভিযান চালালে বেশ কয়েকজন আহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের সহিংসতার বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে এক ব্যক্তিকে মারধরের পর অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
জাতিসংঘ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে মাদাগাস্কার কর্তৃপক্ষকে “অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার” আহ্বান জানায়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন।
তবে প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা বলেছেন, “নিশ্চিতভাবে নিহতের সংখ্যা ১২ এবং তারা সবাই ছিল লুটেরা ও ভাঙচুরকারী।”
প্রথমদিকে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিলেও পরে প্রেসিডেন্ট রাজোয়েলিনা কঠোর পদক্ষেপ নেন। ৬ অক্টোবর তিনি এক সামরিক কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন এবং নতুন মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকটি পদে সেনা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তার ভাষায়, “দেশে এখন আর কোনো বিশৃঙ্খলার প্রয়োজন নেই।”
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ মাদাগাস্কার স্বাধীনতার পর থেকেই প্রায়ই রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ছে। ২০০৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে রাজোয়েলিনা প্রথম ক্ষমতায় আসেন। পরে ২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন, যদিও উভয় নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত ও বিরোধী দলের বর্জিত।
মেহেদী/