জাতিসংঘের পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) সঙ্গে স্বাক্ষরিত নন-প্রোলিফারেশন অ্যাক্ট বা এনপিটি পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করেছে ইরান।
রবিবার (১২ অক্টোবর) ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ব টেলিভিশন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরইবি) কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগেই ইরান সতর্ক করে বলেছিল, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ইউরোপীয় দেশগুলো যদি তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের (স্ন্যাপব্যাক নিষেধাজ্ঞা) প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়, তাহলে তারা আইনত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে যেতে পারে।
আরাগচি বলেন, “আমরা আইএইএ-এর সঙ্গে পরমাণু সহাযোগিতা চুক্তি স্থগিত করেছি। জাতিসংঘ যদি এমন কোনো প্রস্তাব দেয়, যা ইরানের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষার জন্য সহায়ক— আমরা আবার চুক্তিতে ফিরে যাব।”
১৯৬৮ সালে আইইএ’র সঙ্গে নন-প্রোলিফারেশন অ্যাক্ট বা এনপিটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ইরান। সে সময় ইরানের সর্বশেষ রাজা বা শাহ রেজা পাহালভী ইরানের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ছিলেন।
আইএইএ-এর সঙ্গে এএনপিটি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না এবং আইএইএ-কে সহযোগিতা করবে। তাছাড়া তাদের পারমানবিক কর্মসূচী উন্নয়নমূলক ও শান্তিপূর্ণ বেসামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে লাল রেখা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তবে ইরান এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী, এই সমৃদ্ধকরণের অধিকার রাখে।
কিন্তু চলতি বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমানবিকসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপণায় বিমান হামলয়া চালালে আইএইএ-এর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক তিক্ত হয়।
প্রসঙ্গত, গত ৬ জুন আইএইএ এক বিবৃতিতে জানায়— ইরানের সংগ্রহে বর্তমানে ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত আছে। এই ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতার মান ৬০ শতাংশ, যা ৯০ শতাংশে উন্নীত করা যায়। সেক্ষেত্রে অনায়েসেই তা দিয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
আইএইএ এই বিবৃতি দেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় ১২ জুন দিবাগত রাতে ইরানে বিমান অভিযান ‘দ্য রাইজিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েল। অভিযান শুরুর কিছুক্ষণ পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিওবার্তায় জানান, জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার বিবৃতি আমলে নিয়ে এ অভিযান শুরু হয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এ সংঘাত ১২ দিন স্থায়ী ছিল। শেষ পর্যায়ে এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রও। সংঘাতে ইরানের সেনাপ্রধান ও সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কমপক্ষে ১২ জন জ্যেষ্ঠ পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন, ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
কিন্তু সেই ৪০০ কেজি ইউরেনিয়ামের হদিস এখনও পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ এখনও জানে না যে সেই ইউরেনিয়াম কোথায় আছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শেষ হওয়ার পর তেহরান সফর এবং পরমাণু প্রকল্প নিয়ে ইরানের সঙ্গে সংলাপের আগ্রহ জানায় আইএইএ; কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরান সংলাপের জন্য প্রস্তুত এবং আইএইএ-এর প্রতিনিধি দল তেহরান সফরে আসতে পারবেন। কিন্তু পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো তাদের দেখাতে তেহরান বাধ্য নয় ইরান।
এর পর গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির (যারা সম্মিলিতভাবে E3 নামে পরিচিত) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন আব্বাস আরাগচি। বৈঠকে জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে নিতে ইরানকে আহ্বান জানান এই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা, তবে ইরান তার অবস্থানে অনড় থাকায় সেই আহ্বান ব্যর্থ হয়।
ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে জাতিসংঘ। স্ন্যাপব্যাকের আওতায় ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রবর্তিত (যা JCPOA নামে পরিচিত) জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার কার্যকর করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য প্রযুক্তি অর্জনের উপর নিষেধাজ্ঞা। এর আওতায় ইরানের তেল এবং আর্থিক পরিষেবা খাতও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।
এরপর ইরান E3-কে "স্ন্যাপব্যাক মেকানিজম"-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ করে জানায়, স্ন্যাপব্যাক স্পষ্টভাবে " একটি কূটনোইতিক অপব্যবহার"। এরপর, ইরান প্যারিস, বার্লিন এবং লন্ডন থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে।
এরপর এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ইরান তার সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে যায়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, "'স্ন্যাপব্যাক'-এর মাধ্যমে তারা রাস্তা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু মস্তিষ্ক এবং চিন্তাভাবনাই অন্য রাস্তা খুলে বা তৈরি করে দেয়।"
গত রবিবারের সাক্ষাৎকারে আরাগচিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আবার বৈঠক করবেন কি না— এমন এক প্রশ্নের জবাবে আরাগচি বলেন, “আমরা তার প্রয়োজন দেখছি না। ইউরোপের সঙ্গে বৈঠকের আর কোনো ভিত্তি নেই।”
সুলতানা দিনা/