যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তিনি ভেনেজুয়েলায় সিআইএকে (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। তার এই পদক্ষেপকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের বিরুদ্ধে মার্কিন চাপ বৃদ্ধির নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (১৫ অক্টোবল) হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ভেতরে সরাসরি সামরিক হামলার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। এটি হলে সম্প্রতি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর নৌ–আক্রমণের পর সবচেয়ে বড় অভিযান হবে। ওই হামলাগুলোতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন।
ডেমোক্র্যাট নেতারা ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এই হামলাগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী ও বেআইনি হত্যাকাণ্ড বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি এক ভাষণে বলেন, ক্যারিবিয়ানে যুদ্ধ নয়, সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র নয়, সিআইএ–নেতৃত্বাধীন ক্যু দেতা নয়।
মাদুরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে ‘অ্যান্টি–ড্রাগ অপারেশনের’ কথা বলছে, তা আসলে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সরাসরি আগ্রাসনের প্রস্তুতি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে নিউইয়র্ক টাইমসের আগের একটি প্রতিবেদন সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট একটি গোপন নির্দেশনায় ভেনেজুয়েলায় সিআইএ অভিযান অনুমোদন করেছেন।
প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আমরা ভূমি পর্যবেক্ষণ করছি- যা স্থল অভিযানের ইঙ্গিত দেয়। তবে তিনি প্রশ্নের জবাবে জানাননি, সিআইএ কি মাদুরোকে সরাসরি টার্গেট করার ক্ষমতা পেয়েছে কি না। শুধু বলেন, “ভেনেজুয়েলা এখন চাপ অনুভব করছে।”
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি, মানসিক রোগী ও মাদক পাচারকারী পাঠাচ্ছে— যদিও এসব দাবির কোনো প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব মন্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘মাদকচক্রের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে’ রয়েছে— যা সামরিক পদক্ষেপের আইনি যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। উভয় দলেরই সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট কার্যত কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করছেন।
সেনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য জিন শাহিন বলেন, সিআইএকে গোপন অভিযান ও প্রাণঘাতী নৌ–হামলার অনুমতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি অঘোষিত যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে। এতে নেই কোনো স্বচ্ছতা, তদারকি বা নিরাপত্তা কাঠামো।
বুধবার আরেকটি নৌ–হামলার পর প্রেসিডেন্ট মাদুরো দেশজুড়ে সামরিক মহড়া ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বেসামরিক মিলিশিয়াকে প্রস্তুত রাখা হবে দেশের “পর্বত, উপকূল, স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার” রক্ষায়।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী ‘নার্কোটেররিস্ট’ ও ট্রেন দে আরাগুয়া গ্যাংয়ের সদস্যদের লক্ষ্য করে এসব অভিযান চালাচ্ছে। তবে হোয়াইট হাউস কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই আক্রমণগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে।
এছাড়া, ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি একই গ্যাংয়ের অভিযোগ ব্যবহার করে বহু ভেনেজুয়েলানকে দ্রুত নির্বাসন দিয়েছে এবং তাদের পাঠিয়েছে এল সালভাদরের কুখ্যাত কারাগারে।
ট্রাম্প আরও ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভেনেজুয়েলান নাগরিকদের অস্থায়ী বৈধ অবস্থান বাতিল করা হবে।
আগস্টে ওয়াশিংটন মাদুরোর মাথার দাম বাড়িয়ে ৫০ মিলিয়ন ডলার ঘোষণা করে। মাদুরো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি আসলে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র এবং দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হামলা।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা ভেনেজুয়েলায় সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা লাতিন আমেরিকায় নতুন এক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মেহেদী/