যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, তারা ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রয় ব্যবস্থা ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং এই বিক্রয়লব্ধ অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে তাও তারাই ঠিক করবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করার পর দেশটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
গতকাল বুধবার মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানায়, তারা বিশ্ববাজারে ভেনেজুয়েলার তেল ‘বিপণন শুরু করেছে’। এই বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ প্রাথমিকভাবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ব্যাংকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
বিভাগটি আরও জানায়, এই তহবিলগুলো মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমেরিকান এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। প্রাথমিকভাবে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা অনির্দিষ্টকাল চলবে।
এই ঘোষণার পরপরই ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানান যে, ভেনেজুয়েলা তাদের তেলের টাকা দিয়ে শুধুমাত্র আমেরিকার তৈরি পণ্য কিনতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে কৃষি পণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ভেনেজুয়েলার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও সমালোচনা
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গত শনিবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন করেছে। মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা তিনি অস্বীকার করে আসছেন। এই উত্তেজনার মধ্যেই বুধবার মার্কিন বিশেষ বাহিনী উত্তর আটলান্টিকে একটি রুশ জাহাজসহ ভেনেজুয়েলা সংশ্লিষ্ট দুটি জাহাজ জব্দ করেছে।
রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও ডেমোক্র্যাটরা অনেক প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে এই অভিযান কতদিন চলবে, এতে কত খরচ হবে এবং ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ট্রাম্পের এই গোপন পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করে অবিলম্বে সিনেট শুনানির দাবি তুলেছেন।
তিন ধাপের পরিকল্পনা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তারা একটি তিন ধাপের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন:
১. ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা।
২. ভেনেজুয়েলার বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিয়ে জাতীয় পুনর্মিলন শুরু করা।
৩. সবশেষে একটি রাজনৈতিক উত্তরণ বা ট্রানজিশন ঘটানো।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ মনে করেন, এই ব্যবস্থা অনেকটা ১৯৭০-এর দশকের আগের সেই পুরনো ব্যবস্থার মতো, যেখানে তেলের মালিক রাষ্ট্র হলেও উৎপাদন, বিপণন এবং মুনাফার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করত পশ্চিমা কোম্পানিগুলো।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ দখল করার এই চেষ্টা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের অধিকারকে অগ্রাহ্য করে সামরিক আগ্রাসন বা শাসন পরিবর্তনের কৌশল চালানো উচিত নয়।
অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ মাদুরোর অনুপস্থিতিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘‘কোনো বিদেশি শক্তি ভেনেজুয়েলা শাসন করছে না।’’
তবে বিশ্লেষক রেনাটা সেগুরা মনে করেন, দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও চরম অস্থিতিশীল। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী, যাদের হাতে বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের এই শর্তগুলো মেনে নেবে কি না—তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/