গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্য থেকে পেছনে হটার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার এ মন্তব্য করেন তিনি। জোর করে আর্কটিক দ্বীপটি দখলের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি ট্রাম্প। এমন একটি সময় এসব বক্তব্য সামনে এল যখন ইউরোপীয় নেতারা কীভাবে ট্রাম্পকে সামলাবেন, তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
এদিকে শুধু বক্তব্য দিয়ে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও এআই দিয়ে তৈরি ছবির মাধ্যমে ট্রাম্প ন্যাটোর সদস্য দেশ ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এআই দিয়ে তৈরি সে ছবিতে দেখা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা হাতে নিয়ে গ্রিনল্যান্ডে গেছেন। তার ঠিক পেছনে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এই তিনজনের সামনে থাকা কাঠের বোর্ডে লেখা গ্রিনল্যান্ড। পাশে লেখা ‘প্রতিষ্ঠিত-২০২৬’।
ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্য ও আচরণ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে থাকা ন্যাটো জোটকে ভেঙে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। গত বছর এই ধরনের উত্তেজনায় বাজার ও কোম্পানিগুলো মাসের পর মাস অস্থির ছিল। নতুন করে যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেটিও প্রভাব ফেলছে বাজারে। তবে ট্রাম্পের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে ‘অযথা আতঙ্ক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সবার কাছে খুব স্পষ্টভাবে বলেছি গ্রিনল্যান্ড জাতীয় ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আর পিছু হটার সুযোগ নেই। এ নিয়ে সবাই একমত।’
এ ছাড়া তিনি কিছু ব্যক্তিগত বার্তাও ফাঁস করেন। সেসব বার্তার মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর একটি বার্তাও ছিল। ব্যক্তিগত বার্তায় দেখা গেছে, মাখোঁ ট্রাম্পের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কী করছেন’। তিনি ট্রাম্পসহ বৈঠকে বসারও আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প এর আগে হুমকি দিয়েছিলেন, তার কাজে বাধা দিলে ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ১০৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করার কথাও ভাবছে তারা। ৬ মাসের স্থগিতাদেশ শেষ হলে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হতে পারে।
এ ছাড়া ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (এসি আই)-এর কথাও বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এটি এর আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে এমন সরকারি টেন্ডার, বিনিয়োগ বা ব্যাংকিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে।
গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছে ডেনমার্ক
এদিকে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির মুখে সেখানে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছে ডেনমার্ক। ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গত সোমবার ডেনমার্কের সেনাপ্রধান পিটার বয়সেনের নেতৃত্বে একদল সেনা গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় কাঙ্গারলুসুয়াতে পৌঁছেছে। নতুন করে সেখানে ৫৮ জন সেনা পাঠানো হয়েছে। তারা সেখানে অবস্থানরত ৬০ জন ডেনিশ সেনার সঙ্গে যোগ দেবেন। তারা বর্তমানে ‘অপারেশন আর্কটিক এনডিউরেন্স’ নামক একটি বহুজাতিক সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন গতকাল কোপেনহেগেনে সংসদে বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ সময় হয়তো এখনো সামনে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও অর্থনীতি–সব রাজনৈতিক বিষয়েই আলোচনা করতে পারি। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে মৌলিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করা যায় না: সার্বভৌমত্ব, আমাদের দেশের পরিচয়, আমাদের সীমান্ত, আমাদের গণতন্ত্র।’
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েন সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নেতাদের ‘নতুন, স্বাধীন ইউরোপ’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ট্রাম্পেরও এই সপ্তাহে ওই ফোরামে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের বিভাজন আরও গভীর হওয়ায় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বাভাবিক অংশ নয়।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মস্কোর এই দ্বীপ নিয়ে কোনো উদ্দেশ্য নেই। মস্কোতে সাংবাদিকদের লাভরভ বলেন, ‘এটি কখনো নরওয়ের স্বাভাবিক অংশ ছিল না, ডেনমার্কেরও নয়। এটি ছিল একটি ঔপনিবেশিক দখল। বাসিন্দারা এখন এতে অভ্যস্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এটি ভিন্ন বিষয়।’
সোমবার রাতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে বিক্ষোভকারীরা একটি বিশাল ব্যানার নিয়ে মিছিল করেছেন। সে ব্যানারে লেখা ছিল ‘ট্রাম্প অবাঞ্ছিত। কোনো ডব্লিউইএফ নয়! কোনো অলিগার্কি নয়! কোনো সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নয়!’ সূত্র: রয়টার্স