যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের ওপর হামলা চালাতে পারে–এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো অনেকটাই অনুমেয় হলেও এর পরিণতি কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
তেহরানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি মার্কিন বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দেন, তাহলে কী কী সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসছে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ রকম সাতটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১. সীমিত ও নিখুঁত হামলা, কম বেসামরিক হতাহত, গণতন্ত্রে রূপান্তর
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও এর অধীনস্থ আধা সামরিক বাহিনীর সামরিক ঘাঁটি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালাবে। এর ফলে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে। ফলে ইরান আবার আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে এটি আশাবাদী একটি চিত্র। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটালেও গণতন্ত্রে মসৃণ রূপান্তর আনতে পারেনি; বরং দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত ডেকে এনেছে।
২. শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে, তবে নীতি হবে কিছুটা নমনীয়
এটিকে মোটামুটি ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ বলা যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ও শক্তিশালী হামলার পরও শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে, তবে নীতিগতভাবে কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র থাকলেও সেটা বহু ইরানির প্রত্যাশা পূরণ করবে না। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরান সমর্থন কমাবে, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করবে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ দমনে কিছুটা শিথিলতা দেখাবে। তবে এটিও তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাবনাময়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব ৪৭ বছর ধরে পরিবর্তনের প্রতি কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান নিয়েছে। এখন হঠাৎ দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা তাদের আছে বলে মনে হয় না।
৩. শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, জায়গা নেবে সামরিক শাসন
অনেকের মতে, এটি সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট। শাসনব্যবস্থা বহু মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হলেও এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ একে ক্রমেই দুর্বল করলেও ইরানে একটি শক্তিশালী ও বিস্তৃত নিরাপত্তাভিত্তিক ‘ডিপ স্টেট’ রয়েছে, যাদের স্বার্থ বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখন পর্যন্ত বিক্ষোভগুলো সফল না হওয়ার প্রধান কারণ হলো, ক্ষমতাকাঠামোর ভেতর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পক্ষ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়নি। আর ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা ধরে রাখতে সীমাহীন শক্তি ও নিষ্ঠুরতা ব্যবহার করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইরান শেষ পর্যন্ত আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট শক্তিশালী সামরিক নেতৃত্বের হাতে চলে যেতে পারে–এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলা
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা প্রতিশোধ নেবে। তাদের ভাষায়, ‘আঙুল ট্রিগারে রয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান শক্তির সঙ্গে ইরানের তুলনা চলে না। তবে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার রয়েছে, যেগুলোর অনেকই গুহা, ভূগর্ভ বা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লুকানো। বাহরাইন, কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় জড়িত বলে মনে করা কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যেও হামলা চালাতে পারে ইরান। ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবকে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছিল।
এ কারণেই ইরানের উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশীরা, যারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, বর্তমানে চরম উদ্বিগ্ন। যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই আঘাত হয়ে ফিরে আসতে পারে।
৫. উপসাগরে মাইন পেতে প্রতিশোধ
ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০–৮৮) সময় থেকেই এটি একটি পরিচিত হুমকি। তখন ইরান নৌপথে মাইন পেতেছিল এবং সেগুলো অপসারণে রয়্যাল নেভির মাইনসুইপার ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং ২০-২৫ শতাংশ তেল ও তেলজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান দ্রুত সমুদ্র মাইন বসানোর মহড়া চালিয়েছে। বাস্তবে তা করা হলে বিশ্ববাণিজ্য ও তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
৬. পাল্টা হামলায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া
উপসাগরে কর্মরত এক মার্কিন নৌ-ক্যাপ্টেন একবার বলেছিলেন, ইরান থেকে যে হুমকি তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো ‘সোয়ার্ম অ্যাটাক।’ এতে ইরান একযোগে বিপুলসংখ্যক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ও দ্রুতগামী টর্পেডো নৌকা দিয়ে হামলা চালায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সব লক্ষ্য ধ্বংস করতে ব্যর্থ হতে পারে। উপসাগরে এখন মূলত আইআরজিসি নৌবাহিনীই সক্রিয়, যারা প্রচলিত ইরানি নৌবাহিনীকে কার্যত প্রতিস্থাপন করেছে। তাদের অনেক কমান্ডার শাহ আমলে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথে প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন।
এই বাহিনী মূলত অসম বা ‘অ্যাসিমেট্রিক’ যুদ্ধকৌশলে প্রশিক্ষিত, যার লক্ষ্য প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের দুর্বলতা খুঁজে বের করা। যদি কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায় এবং এর নাবিকদের কেউ আটক হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক অপমান হবে।
যদিও এটি কম সম্ভাব্য, তবে ইতিহাসে নজির আছে। ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইউএসএস কোল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৭ জন নাবিক নিহত হন। এর আগেও ১৯৮৭ সালে এক ইরাকি পাইলট ভুল করে ইউএসএস স্টার্কে দুটি এক্সোসেট ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ৩৭ জন মার্কিন নাবিককে হত্যা করে।
৭. শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা
এটি একটি অত্যন্ত বাস্তব ঝুঁকি এবং কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশীদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি ক্ষমতার শূন্যতায় কুর্দি, বালুচিসহ বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমনটা এর আগে সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় দেখা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন দেখতে চায়, বিশেষ করে ইসরায়েল। যারা ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের বড় ধাক্কা দিয়েছে এবং ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে। তবে কেউই চায় না প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশ, যা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র, সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাক এবং একটি বিশাল মানবিক ও শরণার্থীসংকট তৈরি হোক।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, ইরানের সীমান্তের কাছে এত বড় সামরিক শক্তি জড়ো করার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করতে পারেন, এখন পদক্ষেপ না নিলে তার মুখরক্ষা থাকবে না। সে ক্ষেত্রে এমন একটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যার শেষ পরিণতি স্পষ্ট নয় এবং যার প্রভাব হতে পারে গভীর, অপ্রত্যাশিত ও ক্ষতিকর। সূত্র: বিবিসি