ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্যরাতে পৌঁছাল, নারীরা হাতে মশাল নিয়ে ঢাকায় মিছিল শুরু করলেন। যানবাহনের গর্জনের মাঝেও তাদের কণ্ঠে ভেসে উঠল, ‘মানুষ রক্ত দিয়েছে, এখন আমরা চাই সমতা।’
বাংলাদেশের অনেকের কাছে গত কয়েক সপ্তাহ ছিল উদ্যাপনের সময়। ১৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়ন ও কারাবন্দি থাকা বিরোধী নেতারা এবার প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন এবং বহু বছর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সমাবেশ করছেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে আছেন এবং বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে দেশের বহু নারী, বিশেষ করে যারা আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের কাছে এই নির্বাচন আশা যেমন জাগিয়েছে, তেমনি হতাশা ও শঙ্কাও তৈরি করেছে। গতকাল ব্রিটিশভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
রক্ষণশীল ইসলামপন্থি রাজনীতির পুনরুত্থান নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে–এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থীদের তালিকায় নারীর উপস্থিতিও খুবই কম। মধ্যরাতের মিছিলে অংশ নেওয়া ২৫ বছর বয়সী সাবিহা শারমিন বলেন, ‘এটা পরিবর্তন ও সংস্কারের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখছি নারীদের পদ্ধতিগতভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে এবং তাদের অধিকার হুমকির মুখে পড়ছে। আমাদের আশঙ্কা, এই নির্বাচন দেশকে ১০০ বছর পেছনে নিয়ে যাবে।’
হাসিনা আমলে সবচেয়ে বেশি দমনপীড়নের শিকার রাজনৈতিক দলগুলোর একটি ছিল শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাওয়া ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি নিষিদ্ধ ছিল এবং তাদের নেতারা কারাবন্দি, গুম বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। হাসিনার পতনের পর জামায়াতে ইসলামী নতুন উদ্যমে সংগঠিত হয়েছে এবং নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আগে ধারণা করা হচ্ছিল বিএনপি সহজেই জয় পাবে।
জনমত জরিপে এখনো বিএনপির জয়ের ইঙ্গিত মিলছে, তবে জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিক মাত্রায় ভোট পেতে পারে এবং নির্বাচনের পর গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিন বলেন, ‘বড় বিরোধী দল হোক বা সরকার, বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে একটি শক্তিশালী ইসলামপন্থি দল থাকছে, এমনই চিত্র দেখা যাচ্ছে।’
সমালোচকদের মতে, রক্ষণশীল ইসলামপন্থি রাজনীতির প্রভাব ইতোমধ্যে সমাজে ছড়াতে শুরু করেছে। গ্রামীণ এলাকায় ধর্মীয় নেতারা ‘অশালীন’ আখ্যা দিয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলতে বাধা দিয়েছেন। অনেক নারী জানিয়েছেন, চুল ঢেকে না রাখা বা শালীন পোশাক না পরলে হয়রানির ঘটনা বাড়ছে।
জামায়াত তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে সংস্কার, নারীদের নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির কথা বললেও দলটি একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। দলটির নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো নারী দলটির নেতৃত্ব দিতে পারেন না, কারণ তা ‘অইসলামিক’। গত বছরের তার একটি মন্তব্যও নতুন করে সামনে এসেছে, যেখানে তিনি বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন এবং ধর্ষণকে ‘বিয়ের বাইরে নারী-পুরুষের অনৈতিক মিলন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ঢাকার মধ্যরাতের মিছিলে অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী পদার্থবিদ্যার শিক্ষার্থী যায়বা তাহজীব বলেন, ‘এগুলো সেই ধরনের মতাদর্শ, যা আমরা ইরান ও আফগানিস্তানে শুনি। নারীদের সার্বভৌমত্ব, আমাদের স্বাধীনতা সবকিছুই এই নির্বাচনে ঝুঁকির মধ্যে।’
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্রনেতাদের গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ডিসেম্বর মাসে ঘোষণা দেয়, তারা নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জোটে যোগ দেবে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা দলটি এবার মাত্র দুজন নারী প্রার্থী দিয়েছে। এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চিকিৎসক তাজনুভা জাবিন ছিলেন সেই নারীদের একজন, যারা জোট ঘোষণার পর দল ছেড়ে যান। জাবিন বলেন, ‘এটা ছিল স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। জুলাইয়ের আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্নের পরিবর্তনকে প্রতিনিধিত্ব করার ঐতিহাসিক সুযোগ ছিল এটি। কিন্তু তারা জনগণকে ব্যর্থ করেছে এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করেছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এই নির্বাচন বিপ্লবের চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করবে না।’
তিনি আরও বলেন, নারীদের প্রতি ব্যর্থতা শুধু জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির নয়, বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যেও ৫ শতাংশের কম নারী। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস উত্থান-পতনে ভরা। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনে তা প্রাধান্য পায়। ২০১১ সালে সংবিধানে আবারও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনর্বহাল করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করা অনেকেই আসলে পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বে বিরক্ত। ১৯৭১ সালের পর থেকে দেশটি মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুই দলের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। দুই দলই পরিবারতন্ত্র ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান