ইরানে হামলা শুরুর পর ইসরায়েল অনির্দিষ্টকালের জন্য গাজায় সব সীমান্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে কার্যত অবরোধ জারি হয়েছে, যার ফলে খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্যসংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী এখন গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে গাজায় খাদ্যের প্রায় সবটাই বাইরে থেকে আনতে হয়। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, শনিবার পর্যন্ত যে মজুত ছিল, তা আর মাত্র কয়েক দিন চলবে।
ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান হোর্হে আন্দ্রেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ‘সীমান্ত বন্ধ থাকলে এই সপ্তাহেই আমাদের খাবার শেষ হয়ে যাবে। আমরা প্রতিদিন ১০ লাখ গরম খাবার রান্না করছি। আমাদের প্রতিদিনই খাদ্য সরবরাহ দরকার।’
এক আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জানান, গাজায় তাজা খাবারের মজুত মাত্র এক সপ্তাহের মতো আছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য কমিউনিটি বেকারিগুলোর কাছে প্রায় ১০ দিনের রুটির আটা রয়েছে। আর ত্রাণের খাদ্য প্যাকেটের মজুত আছে প্রায় দুই সপ্তাহের মতো।
গত বসন্তে ইসরায়েল গাজায় পূর্ণ অবরোধ আরোপ করেছিল এবং পরে খাদ্য সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ দেয়। এর ফলে গত গ্রীষ্মে সেখানে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিচালিত নতুন লজিস্টিক সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছাতে গিয়ে শত শত মানুষ নিহত হন।
ইরানে ইসরায়েলের হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দুর্ভিক্ষ ও তীব্র খাদ্যসংকটের স্মৃতিতে আতঙ্কিত ফিলিস্তিনিরা দ্রুত বাজারে ছুটে যান প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যায়। ২৫ কেজির এক বস্তা আটার দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৩০ শেকেল থেকে ৮০ থেকে ১০০ শেকেলে পৌঁছেছে। চিনি, ডায়াপার ও রান্নার তেলের মতো অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও দ্বিগুণ হয়েছে।
উত্তর গাজার বাসিন্দা, সাত সন্তানের বাবা ৫০ বছর বয়সী সোবহি আল-জানিন বলেন, ‘গাজায় দুর্ভিক্ষ ফিরে আসার আশঙ্কাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়, গোলাবর্ষণের চেয়েও বড় ভয় সেটি।’ উচ্চমূল্য সত্ত্বেও তিনি খাবার মজুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দাম আরও বাড়ার আগে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে এখন বাজারে যাচ্ছি।’
তবে অনেকেরই যুদ্ধের কারণে বাড়িঘর ও কাজ হারিয়ে সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে, ফলে তারা খাবার মজুত করতে পারছেন না। পাঁচ সন্তানের মা, ৪৯ বছর বয়সী উম মোহাম্মদ হিজাজি বলেন, ‘দাম বাড়ার আগে অন্যদের মতো খাবার কিনে রাখার মতো অর্থ আমার নেই।’ যুদ্ধে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং তারা পাঁচবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে ত্রাণ সংস্থা থেকে পাওয়া সামান্য খাবার আছে, যা সীমান্ত বন্ধ থাকলে কয়েক দিন চলতে পারে।’
এক সপ্তাহ আগের তুলনায় কিছু নিত্যপণ্য এখন আরও দুর্লভ হয়ে উঠেছে। হিজাজি জানান, তিনি শুনেছেন কিছু ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে আরও বেশি দামে বিক্রির আশায় পণ্য মজুত করে রাখছেন। গাজায় দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের বেসামরিক জনগণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করার আইনি দায়িত্ব রয়েছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান জান ইগল্যান্ড বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সেই দায়িত্ব কমায় না।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘কমিউনিটি কিচেনগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তৃত হলেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন বেসামরিকদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম সহজ করতে হবে।’
গাজায় ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী ইসরায়েলি সংস্থা কোঅর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ ইন দ্য টেরিটোরিস (কোগাত) জানায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তাজনিত কারণে গাজায় পণ্য প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। গত সোমবার রাতে সংস্থাটি জানায়, মঙ্গলবার থেকে ধীরে ধীরে মানবিক সহায়তা প্রবেশের জন্য কেরেম শালোম ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, জর্ডান ও মিসরের সঙ্গে তাদের সীমান্ত খোলা রয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চলছে। কোগাতের এক মুখপাত্র দাবি করেন, গাজায় পর্যাপ্ত খাদ্য রয়েছে, তবে কোনো পরিসংখ্যান দেননি। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গাজার ভেতরে যে মজুত আছে, তা কিছু সময়ের জন্য যথেষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান