হোয়াইট হাউসে ফেরার এক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি। জনসমর্থন দ্রুত কমছে, দলের ভেতরে বাড়ছে বিভাজন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয় তার দ্বিতীয় মেয়াদের ভবিষ্যৎকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। গত বুধবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা এখন মাত্র ৩৬ শতাংশ। গত সপ্তাহের তুলনায় এই হার ৪ শতাংশ কমেছে। অথচ গত সপ্তাহেও ৪০ শতাংশ আমেরিকান তার ওপর আস্থা রাখতেন। বর্তমান পরিস্থিতি তার ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে।
তলানিতে জনপ্রিয়তা ও সর্বজনীন অসন্তোষ
ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির মূলভিত্তি তার একনিষ্ঠ জনসমর্থন। বর্তমানে ওই ভিত নড়বড়ে। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে এত নিচে নামেনি। সিএনএনের ‘পোল অফ পোলস’ বলছে, তার গড় সমর্থন এখন ৩৮ শতাংশ। এটি যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য বিপজ্জনক।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, স্বতন্ত্র ভোটারদের মনোভাব। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপ অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর ৬৮ শতাংশই প্রেসিডেন্টকে অপছন্দ করেন। ২০২৪ সালের বিজয়ে যারা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তারা এখন ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। শুধু বিরোধীরাই ক্ষুব্ধ এমনটা নয়, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও অসন্তোষের সুর চড়া। প্রতি পাঁচ রিপাবলিকানের মধ্যে একজন ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে অখুশি। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে এই অসন্তুষ্টির হার ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জনসাধারণের এই অনাস্থা ট্রাম্পের দীর্ঘ ১১ বছরের রাজনৈতিক আধিপত্যের সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মার্গারেট থ্যাচার বা অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের মতো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরাও দীর্ঘ সময় পর জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন। ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও কি সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হাহাকার
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামার প্রধান কারণ মার্কিন অর্থনীতি। জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মাত্র ২৯ শতাংশ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তার পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। জীবনযাত্রার ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। মাত্র ২৫ শতাংশ নাগরিক প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন। মুদ্রাস্ফীতির চাপে আমেরিকান পরিবারগুলো যখন দিশেহারা, তখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলে হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। বর্তমানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে। তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রলের দাম ৩ দশমিক ৫৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত এক মাসেই দাম বেড়েছে এক ডলার। আমেরিকানরা অর্থনীতিকে এখন ‘দুর্বল’ মনে করছেন। এই মনোভাব দলমত নির্বিশেষে সবার। ৪০ শতাংশ রিপাবলিকান ও ৬৬ শতাংশ নির্দলীয় ভোটার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে উদ্বেগজনক বলছেন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে এ বছর মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ট্রাম্পের তথাকথিত ‘সাশ্রয়যোগ্যতার-সংকট’ সমাধান এখন অলীক কল্পনামাত্র। জনদুর্দশার মধ্যেও প্রেসিডেন্টের কিছু মন্তব্য আগুনে ঘি ঢালছে। তিনি বলেছেন, ‘গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রত্যাশার মতো মারাত্মক হয়নি।’ সাধারণ মানুষের কষ্টকে উপহাস করার মতো এমন বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী প্রমাণিত হচ্ছে। এমনকি তার নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা ‘ট্রাম্পআরএক্স’ ওষুধের দাম কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো ৮৭২টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ ও লক্ষ্যহীন সমরকৌশল
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। আমেরিকানরা এই সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দিহান। মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ ইরানে হামলার পক্ষে। বিপরীতে ৬১ শতাংশ নাগরিক প্রকাশ্যে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট ‘প্রস্থান কৌশল’ নেই। প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছেন, ‘এই যুদ্ধই হয়তো আপনার দ্বিতীয় মেয়াদের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে।’ তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বিজয় বা লক্ষ্য অর্জনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব অসংলগ্ন। কখনো তিনি শান্তি চুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী করেন, কখনো আবার ‘আমি পরোয়া করি না’ বলে হুঙ্কার দেন।
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিমান হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নমনীয় করতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এদিকে যুদ্ধের পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ আকাশচুম্বী। প্রথম সপ্তাহেই খরচ হয়েছে ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অর্থ দিয়ে ২০ মিলিয়ন আমেরিকানের স্বাস্থ্যসেবা প্রিমিয়াম কমানো সম্ভব ছিল। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের নীতি মিত্রদের বিভ্রান্ত করছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা; সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এক বিশৃঙ্খলার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষার পরিবর্তে দেশটির বৈরী হস্তক্ষেপ নিয়ে বেশি চিন্তিত।
মিনিয়াপোলিস ও অভিবাসন নীতির বিপর্যয়
ট্রাম্পের ‘গণ নির্বাসন’ কর্মসূচি মার্কিন জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অভিবাসন সংস্থা ‘আইসিই’ এখন অপরাধীদের পরিবর্তে সাধারণ নাগরিকদের হয়রানি করছে। শহরাঞ্চলে গায়ের রঙের ভিত্তিতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এই আগ্রাসী মনোভাবের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মিনিয়াপোলিসে। সেখানে স্থানীয় নাগরিকরা তাদের প্রতিবেশীদের গ্রেপ্তার ঠেকাতে লড়াই করেছেন। একে ‘মিনিয়াপোলিসের যুদ্ধ’ বলা হচ্ছে।
এই সংঘর্ষে রেনে নিকোল গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নামের দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে। ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির নৈতিক ভিত ধসিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতির চাপে ট্রাম্প তার ডেপুটি গ্রেগ বোভিনোকে পদচ্যুত করতে বাধ্য হয়েছেন। বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও সামাজিক অস্থিরতা নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। ট্রাম্পের নিজের দেওয়া ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানটি এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প বিরোধীদের ‘আবর্জনা’ বা ‘নরক থেকে আসা’ বলে অভিহিত করায় বিভক্তি চরমে পৌঁছেছে।
দলের কোন্দল ও নির্বাচনে ভয়
ক্যাপিটল হিলের ওপর ট্রাম্পের যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এপস্টাইন ফাইল নিয়ে আগে থেকেই রিপাবলিকানদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এখন ইরান যুদ্ধ ওই ক্ষোভকে বিদ্রোহের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান মাইক রজার্স জানিয়েছেন, যুদ্ধের ব্যয় ও লক্ষ্য নিয়ে আইনপ্রণেতারা তথ্য পাচ্ছেন না। এমনকি কট্টর রিপাবলিকান সদস্যরাও প্রশ্ন করছেন, কেন আরও সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে।
রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্য। কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্স (সিপিএসি) গত কয়েক বছর ট্রাম্পের বিজয়ী মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ বছর সেখানে বিভাজন স্পষ্ট। ডেমোক্র্যাটরা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। তারা গত এক বছরে রাজ্য বিধানসভায় ৩০টি আসন পুনরুদ্ধার করেছে। এমনকি ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোসংলগ্ন রিপাবলিকান দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনেও ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হয়েছে।
চলতি বছর মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্তত ৩৫ জন রিপাবলিকান সদস্য অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি ১৯৩০ সালের পর অবসরের সংখ্যাটা সর্বোচ্চ। ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব তার দলকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে ফেলছে।
পরিশেষে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক সংকটে, যার সমাধান তার জানা নেই। এক বছর আগে তিনি যে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে উদারপন্থি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন, এখন তিনি নিজেই সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন। জনমত, অর্থনীতি ও যুদ্ধ–এই তিন ফ্রন্টেই তিনি পরাজিত মনে করা যায়।
২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে এর সবই ট্রাম্প-বিরোধী শক্তিশালী জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিচ্ছে। ট্রাম্প কি পারবেন এই ঝড় মোকাবিলা করতে, না কি আমেরিকার রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে বিদায় নেবেন একজন অজনপ্রিয় নেতা হিসেবে? সময় ও আগামী নির্বাচনে এর উত্তর মিলবে।
দ্য ফরেন পলিসি সেন্টার, সিএনএন, ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি ও ওয়াইন নিউজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।