পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা ঘিরে বিশ্বজুড়ে চরম উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পৌঁছানোর কথা থাকলেও ইরান এখনো আলোচনায় বসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তেহরান বলছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনো বৈঠক ফলপ্রসূ হবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ না বাড়িয়ে উল্টো ইরানের অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। এ ছাড়া ওমান সাগরে ইরানি জাহাজে মার্কিন অভিযানের ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন আশার সঞ্চার হলেও শেষ মুহূর্তে তা চরম অনিশ্চয়তায় পর্যবসিত হয়েছে। ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় এই আলোচনার আয়োজন করা হলেও দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গতকাল সোমবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছেন। তবে তেহরান এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তারা মূলত ইসলামাবাদের মধ্যস্থতায় মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের প্রচেষ্টাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ট্রাম্প দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছেন, আলোচনার জন্য তার প্রতিনিধিদল প্রস্তুত। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা আলোচনায় বসতে যাচ্ছি। আমি ধরে নিচ্ছি এই মুহূর্তে কেউ কোনো খেলা খেলছে না।’ ট্রাম্প আরও আভাস দিয়েছেন, আলোচনায় বড় কোনো সাফল্য অর্জিত হলে তিনি সরাসরি ইরানি নেতাদের সঙ্গেও দেখা করতে আগ্রহী। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, জেডি ভ্যান্স গতকাল বিকেল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেননি।
আলোচনার এই ডামাডোলের মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা। পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তা সূত্র নিশ্চিত করেছে, আজ মঙ্গলবার রাত ৮টায় (যুক্তরাষ্ট্র সময়) বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ইরান সময় অনুযায়ী সেটি আগামীকাল বুধবার ভোররাত ৩টা ৩০ মিনিট। এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো আশ্বাস দেননি। উল্টো তিনি হুমকি দিয়েছেন, ইরান শর্ত না মানলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। জবাবে ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের অবকাঠামোতে আঘাত এলে তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগার কেন্দ্রে পাল্টা হামলা চালাবে।
শান্তি আলোচনার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের বন্দরগুলোতে দেওয়া মার্কিন নৌ-অবরোধ। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, এই অবরোধ শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। ট্রাম্প বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিলেও অবরোধ আপাতত বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
চীন থেকে আসা ইরানি জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নিল মার্কিন বাহিনী
এদিকে গতকাল ওমান সাগরে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চীন থেকে আসা ইরানের পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি তুসকা’ মার্কিন অবরোধ ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মার্কিন নৌ সেনারা হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে জাহাজে নেমে সেটি নিয়ন্ত্রণে নেয়। ৬ ঘণ্টা পর জাহাজটির ইঞ্জিন অকেজো করে দেওয়া হয়। ইরান এই ঘটনাকে ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, জাহাজটিতে সাধারণ কর্মীদের পরিবারও ছিল। এই ঘটনায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় আন্তরিক নয় এবং তারা অবাস্তব শর্ত দিচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। বাঘাই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে বিলম্ব করছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ ওয়াশিংটনের প্রতি তীব্র অনাস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা শত্রুকে বিশ্বাস করি না। তারা যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ বাড়িয়ে দিতে পারে।’ তিনি জানান, ইরান আলোচনার পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা
ইসলামাবাদে এই সম্ভাব্য বৈঠককে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ‘রেড জোন’ সিল করে দেওয়া হয়েছে। অতিথিদের জন্য দুটি বিলাসবহুল হোটেল খালি করা হয়েছে। গতকাল সকালেই মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অগ্রবর্তী দল রাওয়ালপিন্ডির নুর খান বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় মিত্ররা অবশ্য আশঙ্কা করছে, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো কোনো স্থায়ী সমাধানের বদলে একটি দ্রুত ও অসার চুক্তি করতে চাইছে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ইরান আলোচনায় বসবে কি না এবং ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবেন কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। তবে তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, তেহরান এখনো তার আগের অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই ‘মার্কিন নাটকে’ অংশ নিতে আগ্রহী নয়। তারা প্রয়োজনে আবারও সামরিক শক্তির মাধ্যমে জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, ডন