ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তাপ এখন চরমে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২৯৪ আসনবিশিষ্ট বিধানসভার প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। এই দফায় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মোট ১৫২টি আসনে ভোট নেওয়া হবে। প্রচারের সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে রাজ্যজুড়ে এখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ডু অর ডাই’ লড়াই চলছে। ভারতের জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচন কেবল তৃণমূল-বিজেপির ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক বিশাল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজেপির পক্ষে প্রচারের ময়দান কাঁপাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, রাজনাথ সিং এবং জেপি নাড্ডার মতো হেভিওয়েট নেতারা। গত সোমবার পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে এক বিশাল রোড-শো থেকে অমিত শাহ দাবি করেছেন, বাংলার মানুষ এবার অনুপ্রবেশকারীদের বিদায় জানাতে বদ্ধপরিকর। ভোটার তালিকায় নাম সংশোধনী এবং প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাতিলের বিতর্ককে কেন্দ্র করে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান সেনাপতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বীরভূম এবং উত্তর ২৪ পরগনায় জনসভাগুলো থেকে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, কেন্দ্র ও ১৯টি রাজ্য মিলে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, কিন্তু তৃণমূল একাই ২২৬টির বেশি আসন নিয়ে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফিরবে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাঁকুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় ঝোড়ো প্রচার চালিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সামাজিক প্রকল্পগুলোর ওপর ভিত্তি করে মানুষের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।
সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা মনোজ কুমার আগরওয়ালের সাফাই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল ফেলেছে। পাশাপাশি, তৃণমূলের নির্বাচনি রণকৌশল পরিচালনাকারী সংস্থা আই-প্যাক আইনি জটিলতার কারণে সাময়িকভাবে তাদের কাজ স্থগিত রাখায় নতুন জল্পনা তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা একে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ফাটল হিসেবে দেখলেও শাসক দল তা উড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং বামফ্রন্ট নেতারা উত্তরবঙ্গ ও শিলিগুড়িতে শক্তি প্রদর্শন করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক কেন্দ্রে বাম-কংগ্রেস জোটের ভোট শতাংশ বাড়লে তা শেষ পর্যন্ত বিজেপির তুলনায় তৃণমূলের জন্য বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।
নিরাপত্তার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ। যেহেতু ২৩ তারিখ তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের সাথে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট একযোগে পড়ছে, তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ি তুঙ্গে। বুথগুলোতে ব্যাপক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে ড্রোন নজরদারি চালানো হচ্ছে। সিএএ ও এনআরসি আতঙ্ক যেমন সীমান্ত জেলাগুলোতে প্রধান ইস্যু, ঠিক তেমনি নিয়োগ দুর্নীতি এবং সন্দেশখালি কাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সরকারবিরোধী হাওয়াকে বিজেপি পুরোদমে কাজে লাগাতে চাইছে। বৃহস্পতিবারের ভোট তাই নির্ধারণ করবে বাংলার ক্ষমতার অলিন্দে শেষ হাসি কে হাসবে—তৃণমূলের ‘ঘরের মেয়ে’ নাকি পদ্ম শিবিরের ‘পরিবর্তনের’ সওয়াল। আগামী ৪ মে ফলাফল প্রকাশের দিনই চূড়ান্ত রায় জানা যাবে।