পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বন্দর করাচি পোর্টে বর্তমানে ৩ হাজারের মতো কনটেইনার আটকে আছে। সেগুলো ইরানে পাঠানোর কথা ছিল। এসব কনটেইনারে কী রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যেসব জাহাজের এগুলো নিতে আসার কথা ছিল, সেগুলো আসেনি। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়তে থাকায়, কবে নাগাদ এসব জাহাজ করাচিতে পৌঁছাতে পারবে, তা নিয়েও কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে গড়ে ওঠা একটি বৃহত্তর চাপ প্রয়োগ কৌশলের অংশ। যার লক্ষ্য পুরো বাণিজ্য বন্ধ করা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণে রাখা।
গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘ইরান আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে। তারা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চায়। টাকার জন্য হাহাকার করছে।’
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রথম ছয় সপ্তাহে তেহরান একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করে, যার মাধ্যমে কোন জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে তা নির্ধারণ করা হতো এবং টোল আদায় করা হতো। কিন্তু ১৩ এপ্রিল থেকে ট্রাম্প প্রশাসন একটি নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যা কার্যত সেসব জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, যেগুলো ইরানের বন্দর থেকে এসেছে বা সেখানে যাওয়ার কথা ছিল।
এই নৌ-অবরোধ শুধু ইরানের রপ্তানিই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। বরং দেশটির জরুরি আমদানির ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক চাপ অনেক ক্ষেত্রে সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের উপদেষ্টা জাভেদ হাসান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘কিছু হিসাব অনুযায়ী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের তেল সংরক্ষণাগার দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে।’
তিনি বলেন, ‘রপ্তানি আয়, যা রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক ভরসা, তা দ্রুত কমে যাবে। আর ইরান কৃষিতে কিছুটা স্বনির্ভরতা অর্জন করলেও খাদ্য নিরাপত্তা এখনো আংশিকভাবে আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল, এটিও একটি বড় চাপের ক্ষেত্র।’
তবে হাসান সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করতে গিয়ে ইরান একটি ‘সহনশীল কাঠামো’ তৈরি করেছে। বর্তমানে সমুদ্রে থাকা ট্যাঙ্কারগুলোতে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী তা প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল হতে পারে, যা কয়েক মাস পর্যন্ত রপ্তানি আয় বজায় রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইরান এরই মধ্যে বিকল্প স্থলপথ ও অভ্যন্তরীণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করছে, যার কিছু মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চল দিয়ে যায়। এ ছাড়া ইরানি কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে বিকল্প রুট তৈরির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। আল-জাজিরা যে নথি দেখেছে, তাতে দেখা যায়, দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প নেতারা ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত পেরিয়ে স্থলপথে এসব কনটেইনার পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারাও এই আলোচনা নিশ্চিত করেছেন। তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের মতে, করাচি বন্দরে আটকে থাকা বিপুল কনটেইনার সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবেই এই ধারণা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানি ট্রাক কনটেইনারগুলো সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাবে। এরপর ইরানের পরিবহন ব্যবস্থা তা গ্রহণ করবে।
নথিতে আরও উল্লেখ আছে, প্রয়োজনে ইরান পাকিস্তানি ট্রাক চালকদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি, যদি তারা সরাসরি দেশের ভেতরে চূড়ান্ত গন্তব্য পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দিতে চায়। যদিও এই স্থলপথ সমুদ্রপথের তুলনায় ধীর এবং ব্যয়বহুল।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা এখনো অনিশ্চিত। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বন্ধ নয়। মার্চের শুরু থেকে ইরান যেসব দেশকে নিজেদের ঘনিষ্ঠ মনে করে, যেমন- পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইরাক। তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে টোল ছাড়াই এবং নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
ভারতের মতো কিছু দেশের জাহাজকেও চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে শর্ত হিসেবে বিস্তারিত নথিপত্র ও আগাম অনুমোদন নিতে হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা