যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগে এক বন্দুকধারীর হামলা দেশটিতে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই হামলার ঘটনা ঘটে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত বার্ষিক হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনার অনুষ্ঠানে।
গত শনিবার রাতে ওয়াশিংটনের একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গুলির শব্দ শোনা গেলে নিরাপত্তা বাহিনী ও সোয়াট দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে একটি বিরল অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। কারণ সমালোচনার মাঝেও তারা একই মুহূর্তে ভয় ও অনিশ্চয়তায় একত্রিত হন।
যদি নিশ্চিত হয় যে ট্রাম্পই হামলার লক্ষ্য ছিলেন, তাহলে গত দুই বছরের কম সময়ে এটি তার বিরুদ্ধে তৃতীয় হত্যাচেষ্টার ঘটনা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের রাজনীতিবিদদের ওপর হামলা, হত্যা ও হুমকির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনজীবনে ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। ঘটনার সময় অনেক অতিথি, যারা ব্ল্যাক টাই ও গাউন পরে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন, গুলির শব্দে টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ক্ষমতাবান ব্যক্তি এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী সাংবাদিক দুজনই এখন সহিংসতার ঝুঁকির মুখে।
গত রবিবার ট্রাম্প বলেন, সহিংসতা যেন জয়ী না হয় এবং অনুষ্ঠানটি আবার আয়োজন করা উচিত। তিনি সিক্সটি মিনিটসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা এটি ৩০ দিনের মধ্যে আবার আয়োজন করা উচিত। আমি ব্যস্ত, আমার যাওয়ার দরকার নেই, কিন্তু এটি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে তিনি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কিছু নয় বলেও মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ‘২০ বছর, ৪০ বছর, এমনকি শত বছর ধরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।’ এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা বন্দুক সহিংসতার বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। বড় সমাবেশ, স্কুল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়, সব জায়গাতেই এখন গুলি হামলার আতঙ্ক রয়েছে। বিদেশিরা এই ঘটনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে সহজে অস্ত্র পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারেন।
ঘটনার পর প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের তদন্ত শুরু হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপ্রধানদের এ ধরনের বড় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা কতটা নিরাপদ, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন, যাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
টেক্সাসের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইকেল ম্যাকল বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও স্পিকার, সবাই এক জায়গায় ছিলেন। যদি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটত, তাহলে পুরো নেতৃত্ব কাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত।’ হামলাকারী হিসেবে অভিযুক্ত ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা কোল টমাস অ্যালেনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সদস্যদের লক্ষ্য করার অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে এর আগেও রাজনৈতিক সহিংসতার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে গ্যাবি গিফর্ডস গুলিবিদ্ধ হন। ২০১৭ সালে স্টিভ স্ক্যালাইজ আহত হন। এ ছাড়া ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাপিটল হিলে আক্রমণের ঘটনা ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা।
এই ধরনের হামলার পর সাধারণত দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করে। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের ভাষাকে উসকানিমূলক বলে অভিযোগ করেন, আর রিপাবলিকানরা দাবি করেন, ট্রাম্পকে স্বৈরশাসক আখ্যা দেওয়াই সহিংসতা বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হবে। অনেক রাজনীতিবিদের পরিবারও তাদের এই পেশায় থাকা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছে।
সবমিলিয়ে এই হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন তুলে এনেছে সামনে। সূত্র: সিএনএন