হামাসের সামরিক শাখার কমান্ডার ইজ্জ আদ-দীন আল-হাদ্দাদ গত শুক্রবার গাজা সিটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন গোষ্ঠীটির এক কর্মকর্তা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, হাদ্দাদ ‘হাজারও ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক ও আইডিএফ সদস্যকে হত্যা, অপহরণ এবং আহত করার জন্য দায়ী ছিলেন।’
ইসরায়েল তাকে ‘৭ অক্টোবরের হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী’ বলেও উল্লেখ করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলের চালানো সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বিবিসিকে দেওয়া তিনজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, গাজা সিটির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আল-মুতাজ নামের একটি আবাসিক ভবনে দুই ভিন্ন দিক থেকে একযোগে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া একটি গাড়িতেও হামলা চালানো হয়।
অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটিতে হামলার পর সেখানে বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উদ্ধারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও আহতদের সরিয়ে নিতে ব্যাপক সমস্যার মুখে পড়েন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ভবনটি থেকে একটি মরদেহ এবং কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে বের করে আনা হয়েছে। পরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করা একটি গাড়িতে দ্বিতীয় দফা বিমান হামলা চালানো হলে তিনজন নিহত হন বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর ধারণা, প্রথম হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর হাদ্দাদকে ওই গাড়িতে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বেসামরিক পোশাক পরা হামাস সদস্যরা একটি পাশের দরজা দিয়ে গুরুতর আহত একজনকে বের করে গাড়িতে তোলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে গাড়িটিতে হামলা চালানো হয়।
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী হাদ্দাদকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে এরপরও ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডজুড়ে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হামাস বারবার অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকার বলছে, হামাস সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করার অধিকার তাদের রয়েছে। ইসরায়েল আবার অভিযোগ করছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে হামাস নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের হাতে দেওয়ার পাশাপাশি অঞ্চলটির নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের কথা বলা হয়।
তবে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। এদিকে হামাস আবার তাদের পুলিশ বাহিনী সক্রিয় করেছে এবং গাজায় নিজেদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহু ও কাটজ বলেন, হাদ্দাদ ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং গাজা উপত্যকাকে সামরিকমুক্ত করার যে চুক্তি ছিল, তা বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।’ তারা আরও বলেন, ‘৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখব।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার মাধ্যমে দুই বছরব্যাপী গাজা যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, এরপর থেকে গাজায় ৭২ হাজার ৭৪৪ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নিহত হয়েছেন ৮৫৭ জন। সূত্র: বিবিসি