ভারতের বেকার যুবসমাজকে ‘তেলাপোকা’ বা ‘ককরোচ’ বলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির করা একটি মন্তব্য ঘিরে দেশটিতে অভূতপূর্ব এক গণ-আন্দোলন শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা মাত্র এক সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপিকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় দুই কোটি অনুসারী পেয়েছে সিজেপি। আর বিজেপির অনুসারী প্রায় ৮৭ লাখ।
বেকারত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ জেন জি বা তরুণ প্রজন্মের এই ডিজিটাল প্রতিরোধ এখন মোদি সরকারের জন্য বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে। সাধারণ একটি ব্যঙ্গচিত্রকে হাতিয়ার করে তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তেলাপোকা এখন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশটির তরুণ সমাজ এই পতঙ্গটিকে নিজেদের অধিকার আদায়ের ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছে।
চলমান এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গত ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। একটি মামলার শুনানির সময় তিনি দেশের বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, যাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই। পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তিনি কেবল জাল ডিগ্রিধারী ছদ্মবেশীদের বুঝিয়েছেন। তবে ততক্ষণে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের দেশে তীব্র বেকারত্বে ভুগতে থাকা তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
পরদিনই অর্থাৎ ১৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতার ছাত্র এবং আম আদমি পার্টির সাবেক রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা এই ব্যঙ্গাত্মক পেজটি এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ইনস্টাগ্রামে প্রায় দুই কোটি অনুসারী সংগ্রহ করেছে, যা ভারতের বর্তমান সরকারি দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী সংখ্যাকেও প্রায় দ্বিগুণ ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে।
দলটি নিজেদের ইশতেহারে ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস’ বলে ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠ ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সব মিডিয়া হাউসের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছে, যেন একটি স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা যায়। আন্দোলনটি কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নেই। এই সপ্তাহের শুরুতে দিল্লির তীব্র দূষিত যমুনা নদী পরিষ্কার করতে বহু তরুণ তেলাপোকার পোশাক পরে রাস্তায় নেমে আসে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দীপক গতকাল শুক্রবার প্রথম একটি আনুষ্ঠানিক পিটিশন দায়ের করেছেন। এই পিটিশনে তিনি বহুল আলোচিত নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দেশবাসীকে এই পিটিশনে ব্যাপকভাবে স্বাক্ষর করার আহ্বান জানান।
‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ নামে নতুন অ্যাকাউন্ট
এই আন্দোলনের তীব্রতা দেখে সরকারপন্থি প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। গত বৃহস্পতিবার সিজেপির মূল এক্স অ্যাকাউন্টটি আইনি নোটিশের অজুহাতে ভারতে ব্লক বা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে দমে না গিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ নামে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে তারা প্রতিবাদের নতুন পোস্ট দেয়।
জানা গেছে, বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ৮৭ লাখ। অন্যদিকে মাত্র কয়েক দিনে সিজেপির ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল না হলেও জনপ্রিয়তার নিরিখে দেশের বড় দলগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে এই ‘পার্টি’।
বিরোধী দলগুলোর উচিত তরুণদের ক্ষোভকে কাজে লাগানো: শশী থারুর
মোদি সরকারের এই ডিজিটাল সেন্সরশিপের তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস দলের প্রবীণ সংসদ সদস্য শশী থারুর। তিনি এই অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে ‘বিপর্যয়কর এবং গভীর অবিবেচকের মতো কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। থারুর বলেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত, কৌতুক ও হতাশা প্রকাশের জায়গা থাকা উচিত এবং দেশের বিরোধী দলগুলোর উচিত তরুণদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্রও ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ হয়ে মুখ খুলেছেন। এক্স-এ কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, ‘দেশের সরকার যুবসমাজকে এতটাই ভয় পায় যে একটি অনলাইন আন্দোলনকেও সহ্য করতে পারছে না।’ তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য, মহুয়া মৈত্র নিজেও ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) একজন ফলোয়ার। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের আরেক নেতা শশী পাঁজা।
আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের মা-বাবা
এদিকে এই আন্দোলনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের মা-বাবা। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের বাসিন্দা ভগবান ও অনিতা দীপক জানান, তাদের ছেলে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারে। ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা দুই রাত ধরে ঘুমাতে পারেননি। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা চান না তাদের ছেলে রাজনীতিতে জড়াক। তারা চান অভিজিৎ পড়াশোনা শেষ করে পুনে বা দিল্লিতে সাধারণ একটি চাকরি করুক। অভিজিতের মা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রথম এই খবর জানতে পারেন এবং তিনি এই আন্দোলনে ছেলের পাশে নেই বলে জানান। অভিজিৎ নিজেও এক সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
যে কারণে ককরোচ পার্টি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেল
সমালোচকদের কেউ কেউ এই আন্দোলনকে শহুরে মধ্যবিত্তের একটি ক্ষণস্থায়ী ‘মিম’ বা তামাশা বলে অভিহিত করলেও দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন যেভাবে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং নেপালে যেভাবে তরুণদের হাত ধরে র্যাপার বালেন্দ্র শাহ ক্ষমতায় এসেছেন, সিজেপিকে অনেকেই সেই ধারার অংশ মনে করছেন। যদিও অভিজিৎ দীপক জানিয়েছেন, তারা কোনো সহিংসতা চান না এবং সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের অধিকারের লড়াই চালিয়ে যাবেন।
কর্ণাটকের আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের ২৫ বছর বা তার কম বয়সী স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশই আজ বেকার। কর্মসংস্থানের এই ভয়াবহ সংকট ও তরুণদের তীব্র ক্ষোভের মুখে দাঁড়িয়ে জেন জির এই ‘তেলাপোকা বিদ্রোহ’ এখন ভারতের ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের জন্য এক বড় পরীক্ষা।
তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে, সিজেপি অনেক তরুণ ভারতীয়ের হতাশা ও অসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, তারা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে রাজনীতি দেখলেও নিজেদের মতামত বা স্বার্থের যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পান না। ভারতের ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও তরুণদের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম।
সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, ২৯ শতাংশ তরুণ কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না এবং মাত্র ১১ শতাংশ কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ভাষায়, ‘অনেক মানুষ হতাশ, কারণ তারা মনে করেন তাদের কথা শোনা হচ্ছে না এবং তাদের যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্বও করা হচ্ছে না।’
ভারত এখনো বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো বড় রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়নি। তবে যেসব কারণে সেখানে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলোই ভারতে বিদ্যমান বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দেশের অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও কর্মসংস্থান, আয়বৈষম্য এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। অনেক তরুণের কাছে উচ্চশিক্ষা আর নিশ্চিত চাকরি বা স্থিতিশীল জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির স্বপ্নও আগের তুলনায় অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক অবশ্য নেপাল বা শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে ভারতের তুলনা করতে রাজি নন। তার মতে, ভারতের পরিস্থিতি আলাদা। তবে তিনি স্বীকার করেন, তরুণদের মধ্যে হতাশা বাস্তব এবং সেটি এখন মূলত সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। দীপক বলেন, ‘জেনারেশন জেড বা জেন জি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়।’ সূত্র: সিএনএন