কয়েক দিন আগেই পোল্যান্ডে আরও ৫ হাজার সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পোল্যান্ডের নতুন ডানপন্থি প্রেসিডেন্টের বিজয়ের পরপরই এ সিদ্ধান্ত জানান তিনি। ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর আলোচনার মধ্যেই ট্রাম্পের এই হঠাৎ পদক্ষেপ ইউরোপে ওয়াশিংটনের সামরিক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সিদ্ধান্তটি এমন একসময়ে এল, যার মাত্র কয়েক দিন আগেই পেন্টাগন পোল্যান্ডে প্রায় ৪ হাজার সেনা পাঠানোর একটি পরিকল্পনা বাতিল করেছিল। ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর অংশ হিসেবে পেন্টাগন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
এখন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে নানা প্রশ্ন উঠছে। ট্রাম্পের এই নির্দেশ কি ইউরোপের সামরিক কৌশলের অংশ, নাকি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে তার শুধুই একধরনের লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক নীতির প্রতিফলন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প কী নির্দেশ দিয়েছেন এবং কোন সেনারা এতে জড়িত?
ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে একটি নতুন সেনা মোতায়েন হিসেবে বর্ণনা করলেও মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এটি আসলে পেন্টাগনের আগের সিদ্ধান্তটি বাতিল করার নামান্তর। গত সপ্তাহে পেন্টাগন হঠাৎ করেই ‘সেকেন্ড আর্মড ব্রিগেড কমব্যাট টিম অব দ্য ফার্স্ট ক্যাভালরি ডিভিশন’-এর মোতায়েন স্থগিত করে। টেক্সাসভিত্তিক এই ইউনিটে ৪ হাজারের বেশি সেনা রয়েছে। তারা পোল্যান্ড ও পূর্ব ইউরোপে দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প পরে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে জিজ্ঞেস করেন- কেন এই সেনা মোতায়েন বাতিল করা হলো? ট্রাম্প তাকে বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয় পোল্যান্ডের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা।
বেশ কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ব্ল্যাক জ্যাক ব্রিগেড’ নামে পরিচিত এই ইউনিটের কিছু অংশ এরই মধ্যে তাদের সদস্য ও সরঞ্জাম পাঠানো শুরু করে দিয়েছিল, তখনই সেনা মোতায়েন স্থগিত করা হয়।
পেন্টাগন এখনো নিশ্চিত করেনি, ট্রাম্প ঘোষিত নতুন ৫ হাজার সেনা আগের বাতিল হওয়া সেই সেনারাই কি না। নাকি তাদের জার্মানিসহ ইউরোপের অন্য কোনো ঘাঁটি থেকে আবার পাঠানো হবে। হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন এখন পর্যন্ত এই নতুন সেনা মোতায়েন নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পোল্যান্ড ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে ওয়াশিংটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা পাঠানোর প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ট্রাম্প কেন এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? এই ঘোষণা সাম্প্রতিক সময়ের সেই ইঙ্গিতের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে বলা হচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমাতে যাচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে ওয়াশিংটন ঘোষণা করেছিল, তারা জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা সরিয়ে নেবে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডেরিখ মার্জের প্রকাশ্য বিরোধের পর এই সিদ্ধান্ত আসে। পরে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, সেনা কমানোর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
একই সময়ে ট্রাম্প বারবার ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, তারা প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় করছে না এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে যথেষ্ট সমর্থনও দিচ্ছে না।
এসবের জেরে পোল্যান্ড ন্যাটোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। দেশটি তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের অন্যতম শক্ত সমর্থক হিসেবেও পোল্যান্ড অবস্থান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের ভূখণ্ডে আরও বড় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে চাপ দিয়ে আসছে।
ফলে এই সেনা মোতায়েনকে একদিকে কৌশলগত, অন্যদিকে রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এটি যেমন ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তকে আরও শক্তিশালী করছে, তেমনি ইউরোপে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজনকে পুরস্কৃতও করছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন তিনি ইউরোপের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন।
তবে পুরো ঘোষণাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ওয়াশিংটনের ইউরোপ নীতি নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তাও সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠছে যে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ন্যাটোর প্রতি তাদের অঙ্গীকার কমাচ্ছে, নাকি ট্রাম্প নিজের প্রতি বেশি অনুগত সরকারগুলোর ভিত্তিতে নতুনভাবে সম্পর্ক সাজাচ্ছেন, সে বিষয়টি নিয়েও। সূত্র: আল-জাজিরা