ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর ১০০ দিন পার হয়ে গেলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনো তাদের এই শীর্ষ নেতাকে দাফন করতে পারেনি।
যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানি রাজনীতিতে এই দীর্ঘ বিলম্ব এখন অন্যতম সংবেদনশীল ও নজিরবিহীন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একই হামলায় নিহত অন্যান্য সামরিক কমান্ডার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাফন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অথচ খামেনির জন্য একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখনো তা হয়নি। তেহরানের পৌর কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, চলতি মাসের শেষের দিকে তার দাফন সম্পন্ন এবং কয়েক দিনব্যাপী দোয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তবে এই দীর্ঘ বিলম্ব শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই মানায় না। কারণ ইসলামে মৃতদেহ দ্রুত দাফন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সমসাময়িক আলেমরাও মনে করেন, মৃতদেহের প্রতি অসম্মান হওয়ার ঝুঁকি থাকলে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব এড়িয়ে চলা উচিত। দাফন না হওয়ায় খামেনির মরদেহের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জনমনে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। একই হামলায় নিহত অন্য কর্মকর্তাদের মরদেহ কয়েক সপ্তাহ পর উদ্ধার করা হয়েছিল। তাদের মরদেহ ক্ষতবিক্ষত হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। তবে খামেনির মরদেহের বর্তমান অবস্থা বা অবস্থান নিয়ে কর্মকর্তারা কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও নিখোঁজ উত্তরসূরি
দাফনের এই অমীমাংসিত প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় রহস্য। খামেনির উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি। বাবার মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে যে হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়েছে, সেটির পর তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তিনি সামান্য আঘাত পেলেও সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। তা সত্ত্বেও তার গুরুতর আহত হওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
মোজতবা খামেনি সুস্থ ও সক্রিয় থাকলে তিনি নিঃসন্দেহে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবেন। ফলে তার যেকোনো বড় পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স বা জনসমক্ষে আসা একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতা নতুন নেতার জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কারণ একজন সর্বোচ্চ নেতার জানাজা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা প্রদর্শনেরও একটি বড় মাধ্যম। এমন একটি বড় ইভেন্টে নতুন উত্তরসূরির অনুপস্থিতি যেমন ব্যাখ্যা করা কঠিন, ঠিক তেমনি তার উপস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা হয়তো দেশের প্রশাসন এই মুহূর্তে নিতে চাচ্ছে না।
জানাজার রাজনৈতিক দিক
এই বিলম্বের পেছনে একটি রাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে। ইরান বরাবরই এই ধরনের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করে থাকে। এর বড় উদাহরণ ছিল রেভল্যুশনারি গার্ডসের কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির জানাজা। তার মরদেহটি কেরমানে দাফন করার আগে বাগদাদ, নাজাফ, কারবালা, মাশহাদ, তেহরান এবং কোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছিল, ওই অনুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। পরে সেই ছবিগুলো সরকারের প্রচারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও কেরমানে দাফনের সময় হুড়োহুড়িতে ৫৬ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি তখন আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। কর্মকর্তারা খামেনির জন্যও ঠিক একই ধরনের এক বিশাল জনসমাগমের আশা করছেন। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী এই পরিস্থিতিতে এত বড় একটি আয়োজন করা লজিস্টিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
আপাতত ইরান এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর ১০০ দিন পরও দেশটিতে নতুন উত্তরসূরি নির্বাচন করা হলেও তাকে জনগণের সামনে আনা হয়নি। সাবেক নেতাকে এক ঐতিহাসিক বিদায় জানানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আর এই সবকিছু নিয়েই এখন চারদিকে নানা প্রশ্ন উঠছে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল