দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পৃথিবীর তৃতীয় মেরুতে কোনো বাংলাদেশির সফল অভিযান হয়নি। ২০১৩ সালের পর সেই খরা কাটালেন ডা. বাবর আলী। রবিবার (১৯ মে) সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন তিনি। বেসক্যাম্প টিমের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন অভিযানের প্রধান সমন্বয়ক ফরহান জামান।
বাবর আলীর এমন অর্জনে বেশ খুশি তার পরিবার। তবে ছেলে সুস্থভাবে ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তা কাজ করছে তার মা-বাবার মনে। ছেলের এমন গৌরবময় অর্জনে তার পরিবার কথা বলেছে খবরের কাগজের সঙ্গে।
বাবর আলীর মা লুৎফুন্নাহার বেগম বলেন, ‘ছেলের এমন অর্জনে অনুভূতি প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা অনেক আনন্দিত। তবে সে এখনো পর্বতের চূড়া থেকে নামেনি। তাই আমরা শঙ্কিত। যতক্ষণ সে ফিরে আসবে না ততক্ষণ দুশ্চিন্তা থাকবে। সবার কাছে দোয়া চাই সে যাতে নিরাপদে পর্বতের চূড়া থেকে নেমে আসতে পারে। আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় চেয়েছি সে ডাক্তার হোক। সে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়, আমরা খুব খুশি ছিলাম। কিন্তু তার শখ ছিল ঘোরাঘুরি করা। আস্তে আস্তে পর্বতারোহণ তার নেশা হয়ে গেল। ডাক্তারি পাস করার পর সে কিছুদিন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছে। পরে সেটাও ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল।’
বাবরের মা আরও বলেন, ‘সে আমাদের জানায়, ডাক্তারি পড়ে তোমাদের মনের আশা পূরণ করেছি। কিন্তু ডাক্তার হয়ে ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ডিউটি করতে চাই না। এখন আমি আমার আশা পূরণ করতে চাই। তাই আমরা তার স্বপ্ন পূরণে কোনো বাধা দেইনি। তবে আজ তার এই অর্জনে আমরা খুব খুশি। সে যেন আমাদের কাছে সুস্থভাবে ফিরে আসতে পারে, সেই কামনা করি।’
বাবর আলীর ছোট ভাই আবীর আলী খবরের কাগজকে বলেন, “আমি সকাল ৯টার দিকে ভাইয়ার এভারেস্ট জয়ের বিষয়টা আম্মুর কাছ থেকে জানতে পেরেছি। উনি যখন মেডিকেলে লেখাপড়া করতেন তখন থেকেই তার পাহাড়ের প্রতি আকর্ষণ। বেশিরভাগ সময় বান্দরবান চলে যেতেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। দেশের ৬৪ জেলা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেছেন। এটার ওপর ভিত্তি করে তিনি ‘পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা’ নামে একটা বই লিখেছেন। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় সাইকেল ভ্রমণের ওপর লিখেছেন ‘সাইকেলের সওয়ারি’ নামে একটা বই। অনুবাদ করেছেন একটি গ্রন্থ ‘ম্যালরি ও এভারেস্ট’। আমরা সবাই ভাইয়ার এমন অর্জনে খুব বেশি।”
বাবরের ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের পক্ষ হতে প্রধান অভিযান সমন্বয়ক ফরহাদ জামান বলেন, ‘বাবর আলীর এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি পুরো বাংলাদেশের জন্য এক গর্বের বিষয়। এটি আমাদের দেশের তরুণদের আরও বড় স্বপ্ন দেখার এবং সেগুলো পূরণ করার জন্য অনুপ্রাণিত করবে। এই অভিযানের পেছনে ছিল অসংখ্য মানুষের অবদান এবং স্বপ্ন। আমরা তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।’
নেপালের স্নোয়ি হরাইজন নামক প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিযানে এই সামিটে বাবরের সঙ্গে ছিলেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং পর্বতারোহণ গাইড বীর বাহাদুর তামাং।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর নজুমিয়াহাটের বুড়িশ্চর এলাকার লেয়াকত আলী ও লুৎফুন্নাহার বেগমের দ্বিতীয় সন্তান বাবর। ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ৫১তম ব্যাচের ছাত্র। কিছুদিন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করলেও আগের অভিযানের সময় ছুটি না মেলায় ত্যাগ করেন চাকরির মোহ।
বাবরের এই অভিযানের মোট খরচ হচ্ছে ৪৫ লাখ টাকা। এর মূল পৃষ্ঠপোষক ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার লিমিটেড। আর সহ-পৃষ্ঠপোষক এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ঢাকা ডাইভার্স ক্লাব, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ব্লু জে, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী, গিরি, ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। এ ছাড়া অভিযানের জন্য গণতহবিল সংগ্রহে অংশ নেন দেশ-বিদেশের নানা সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠন এবং অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষী। অভিযানের সার্বিক সমন্বয় করেছে বাবর আলীর নিজের ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স।
গত ১ এপ্রিল নেপালের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন বাবর আলী। প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করে ৪ এপ্রিল কাঠমান্ডু থেকে উড়ে যান পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দর লুকলাতে। সেই লুকলা থেকে পথচলা শুরু করেন শত কিংবদন্তি পর্বতারোহীদের চলা পথে। ১০ এপ্রিল বাবর পৌঁছে যান এভারেস্ট বেসক্যাম্পে। কয়েকদিন অপেক্ষার পর গত ১৬ এপ্রিল তিনি সামিট করেন ২০ হাজার ৭৫ ফুট উচ্চতার লবুচে ইস্ট পর্বত। এরপর আবারও বেসক্যাম্পে ফিরে গত ২৬ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে ক্যাম্প-২ পর্যন্ত ঘুরে এসে শেষ করেন উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর্ব। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা।
এরপরই ১৪ মে মাঝরাতে বেসক্যাম্প থেকে শুরু হয় বাবরের স্বপ্নের পথে যাত্রা। প্রথম দিনেই সরাসরি উঠেন ক্যাম্প ২-এ, যার উচ্চতা ২১ হাজার ৩০০ ফুট। পরিকল্পনা অনুসারে সেখানে দুইরাত কাটিয়ে বাবর ১৮ মে ২৪ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতার ক্যাম্প-৩ এবং ১৯ মে ক্যাম্প ৪-এ উঠেন। ২৬ হাজার ফুট উচ্চতার এই ক্যাম্পের ওপরের অংশকে বলা হয় ডেথ জোন। অবশেষে ১৮ মে মাঝরাতে আবারও শুরু হয় বাবরের যাত্রা এবং ভোরের প্রথম কিরণে ২৯ হাজার ৩১ ফুট উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় উড়িয়ে দেন বাংলাদেশের পতাকা।
আরোহণ করবেন লোৎসেও
বাবরের অভিযান কিন্তু এখনো শেষ নয়। বাবরের আসল লক্ষ্য শুধু এভারেস্ট নয়, সঙ্গে লাগোয়া পৃথিবীর চতুর্থ শীর্ষ পর্বত লোৎসেও। রবিবার ক্যাম্প ৪-এ নেমে মাঝরাতে আবারও শুরু করবেন দ্বিতীয় লক্ষ্যের পথে যাত্রা এবং সব অনুকূলে থাকলে ভোরে পৌঁছে যাবেন এর চূড়ায়। এই লোৎসেতে এর আগে কোনো বাংলাদেশি সামিট করেননি। তাই লক্ষ্য পূরণ হলে বাবর আলী এই বিপজ্জনক খেলায় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবেন।
অধ্যাবসায় শুরু হয়েছিল ১০ বছর আগে
কাগজে-কলমে বাবর আলীর এই অভিযান আজ থেকে দেড় মাস আগে শুরু হলেও তার কঠিন অধ্যাবসায় শুরু হয়েছিল ১০ বছর আগে। ২০১৪ সালে পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ক্লাব সতীর্থদের নিয়ে নেপাল এবং ভারতের বহু পর্বতে অভিযান করেছেন তিনি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি সামিট করেন নেপালের আমা দাবলাম পর্বত। পর্বতারোহণ তার নেশা হলেও সাইক্লিং, ম্যারাথন, স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটিতেও নিয়মিত জড়িত ছিলেন।
অ্যাডভেঞ্চারের তাড়নায় পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন দেশের ৬৪ জেলা, সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন ভারতের কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর পথ। বান্দরবান থেকে হিমালয়, সুন্দরবন থেকে দক্ষিণ ভারত, যে জনপদেই তিনি গেছেন, সাক্ষী হয়েছেন অভূতপূর্ব কিছু মুহূর্তের। প্রকৃতির প্রতি তার এই ভালোবাসা এবং বিস্ময় প্রতিনিয়তই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সেই সূত্র ধরেই অবশেষে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া থেকে পৃথিবী দেখার স্বপ্নও সার্থক করেছেন এই তরুণ পর্বতারোহী।
২০১৪ সালে নেপালের ১৫ হাজার ৬৮২ ফুট উচ্চতার কেয়াঞ্জিন রি, ১৬ হাজার ৩৭১ ফুট উচ্চতার সারগো রি ও ১৬ হাজার ৮৮০ ফুট উচ্চতার সুরিয়া পিক জয় করেন। ২০১৬ সালে ভারতের ২০ হাজার ৬৬ ফুট উচ্চতার মাউন্ট ইয়ানাম ও ২০১৭ সালে ২০ হাজার ২৫০ ফুট উচ্চতার মাউন্ট ফাব্রাং জয় করেন। ২০১৯ সালে ভারতে ২০ হাজার ৬৮০ ফুট উচ্চতার মাউন্ট সিসিকেএন, ২০ হাজার ১৫০ ফুট উচ্চতার মাউন্ট শিবা ও ২০ হাজার ৭২৮ ফুট উচ্চতার মাউন্ট রামজাক জয় করেন। ২০২২ সালে নেপালে ২২ হাজার ৩৪৯ ফুট উচ্চতার আমা দাব্লাম জয় করেন। ২০২৩ সালে নেপালের ১৯ হাজার ৮৭৯ ফুট উচ্চতার চুলু ফার-ইস্ট ও ২১ হাজার ৬০১ ফুট উচ্চতার চুলু ইস্ট জয় করেন বাবর।
এর আগে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০১০ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ এ পর্বতশৃঙ্গ জয় করেন মুসা ইব্রাহীম। এক বছর পর ২০১১ সালে দ্বিতীয় এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে নাম লেখান এম এ মুহিত। ২০১২ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টে আরোহণ করেন নিশাত মজুমদার। একই বছর সপ্তাহের ব্যবধানে সেখানে পা রাখেন আরেক বাংলাদেশি নারী ওয়াসফিয়া নাজরীন। ২০১৩ সালের ২০ মে মো. খালেদ হোসাইন এভারেস্টে আরোহণ করেন।
সালমান/