দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক সড়ক, মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, মানবিক বিষয় হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক।
ফাওজুল কবির বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা এখন কোনো পরিসংখ্যান নয়। গত নয় মাসে ও তার আগের নয় মাসে সড়কে কত জন নিহত হয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় কত প্রবৃদ্ধি হল, এসব এখন আর পরিসংখ্যান নয়। সড়ক দুর্ঘটনাকে আমরা মানবিক বিষয় হিসেবে দেখছি। কারণ এ সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু কারো বাবা, ভাই বা বোন নয়, এতে একেকটি সম্ভাবনারও অপমৃত্যু হয়। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার গলদ, সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার গাফিলতি তদন্ত করতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এখন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ মোতাবেক কাজ করবে।’
উপদেষ্টার বক্তব্যের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা বছরের ২৯ জুলাই তারিখটি জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান।
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে বাসচাপায় নিহত হন শহিদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল করিম ওরফে রাজীব (১৭) এবং একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়া খানম ওরফে মিম (১৬)।
আহত হন আরও ১০ থেকে ১৫ শিক্ষার্থী।
ঘটনার দিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা উত্তাল হয়ে উঠেন। পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ প্রণয়ন করে।
তবে এই আইন নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রবল আপত্তি রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে পরিবহন শ্রমিকদের কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও পরে পরিবহন মালিকদের চাপে আওয়ামী লীগ সরকার তা কমিয়ে আনে, সংশোধিত হয় আইন।
মঙ্গলবার সড়ক দিবসের আয়োজনে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নিশিতা জাহান সেই আইন বাতিল করে নতুন করে সড়ক আইন প্রণয়নের দাবি জানান।
পাশাপাশি সড়ক পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সদস্য সচিব, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি তানজিদ মো. সোহরাব রেজা তার বক্তব্যে সড়ক ব্যবস্থাপনা খাতে নৈরাজ্যের নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
তার বক্তব্যে পরিবহন শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য, সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়নে সব কর্তৃপক্ষের গাফিলতির নানা দিক উঠে আসে।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কোনোভাবেই দৈবাৎ ঘটনা নয়। প্রতিদিন গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মেরে ফেলাকে আমি বলব অবকাঠামোগত হত্যা। এখানে পলিসি লেভেলের ভুল তো রয়েছেই, সঙ্গে রয়েছে প্রায়োগিক দুর্বলতা।
সোহরার রেজা রাজধানীর সড়কে উন্নতমানের গণপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বারোপ করে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
একইসঙ্গে তিনি স্কুলের পাঠ্যসূচিতে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির দাবিও জানান।
এর আগে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. ইয়াছীন বলেন, বাস্তবিক অর্থেই আমরা সড়ক নির্বিঘ্ন করতে পারিনি। দিনে দিনে দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়ছে। এ সেক্টরে যারা কাজ করছি, বিশেষ করে যারা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করছি, তারা এখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি, তাই এর ব্যর্থতার বেশিরভাগ আমাদের।
এ সময় তিনি ২০২০-২২ সালে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের একটি সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পরিচালিত সে জরিপে দেখা গেছে, নিহতদের শতকরা ৩০ ভাগ শিশু যাদের বয়স পাঁচ থেকে নয় বছর। সড়কে নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। আমরা ভুলে যাইনি ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কে নিহত শিক্ষার্থী দিয়া ও রাজিবের কথা। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবিতে শিক্ষার্থীরাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে স্বল্প সম্পদ নিয়েও সড়ক নিরাপদ করতে হয়।
মো. ইয়াছীন সড়ক পরিবহন খাতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ ও পরিবহন মালিক, শ্রমিকদের সমন্বয়ে গুরুত্ব দেন।
জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. মো. আবদুল মোমেন তার চাকরি জীবনে ঢাকার জেলা প্রশাসক, বিআরটিএর চেয়ারম্যান, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক, সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
সে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সময় তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন খাতে শাজাহান খানরা কিন্তু এখনো রয়ে গেছেন। শাজাহান খান অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স প্রদানে চাপ দিয়ে বলতেন, ড্রাইভাররা সড়কে গরু আর বলদ চিনলেই হবে। এমন মানুষ এখনো রয়ে গেছেন পরিবহন খাতে। তাদের চিনে রাখা দরকার।
আবদুল মোমেন জানান, ঢাকার সড়ক নিরাপত্তায় তিনশো জনেরও বেশি প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধি দ্রুত কাজ শুরু করবে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে। এ সংখ্যা ক্রমে বাড়বে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীরা বেতন পাবেন বলেও জানান সিনিয়র সচিব ড. মো. আবদুল মোমেন।
গত ৯ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডায় সড়কে নিহত হন তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মী তাসনিম জাহান, গুরুতর আহত হন তার বোন নুসরাত জাহান।
এ অনুষ্ঠানে তাদের বাবা এস এম সাইফুল আলম সগীরের হাতে ছয় লাখ টাকার চেক তুলে দেন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান।
এস এম সাইফুল আলম সগীর পরে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, দ্বিতীয়বার স্বাধীনতার পরে গণতান্ত্রিক সরকার যেন এমন কোনো ব্যবস্থা করে যাতে আর কোনো তাসনিম হারিয়ে না যায়।
জয়ন্ত/পপি/