ইদানীং সামরিক বাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন মহলে বেশ আলোচনা এবং সমালোচনা হচ্ছে। আওয়ামী সরকারের পতনের পর এ ধরনের সামাজিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতার উন্মেষ হওয়াটা বাঙালির জাতীয় চরিত্রের একটা পুরোনো বৈশিষ্ট্য। হাসিনা সরকারের অনুচরসহ দেশ থেকে পলায়নের ঘটনাটিতে ফ্যাসিস্টদের যে পতন হয়েছে, তা সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিকল্পনার একটা অংশ বলে সামাজিক মাধ্যমগুলোয় বেশ দৃঢ়ভাবে প্রচারিত হচ্ছে। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ অধিকারী কর্মকর্তাদের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে আলোচনার বহু পয়েন্ট আছে, কিন্তু কিছু বিষয় আছে যেগুলো প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামরিক বাহিনীর স্বতন্ত্র চরিত্রের পার্থক্যসূচক সামাজিক অবস্থানকে সংজ্ঞায়িত করে।
যখনই আমরা ‘সামরিক’ শব্দটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করি, তখন মূলত দুটি বিষয় তর্ক-বিতর্কের মুখ্য উপাদান হিসেবে যুক্তির স্থান দখল করে থাকে। প্রথমত, সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পেশাগত অবস্থান নিয়ে তাত্ত্বিক বাগবিতণ্ডা এবং দ্বিতীয়ত, এই প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিশেষত জেনারেল পদমর্যাদা কমান্ডারদের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমারেখা। বুদ্ধিজীবী পরিমণ্ডলে সাধারণভাবে স্বীকৃত দেশে প্রথাগত নিরাপত্তা রাষ্ট্র সরকারি নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে সামরিক নায়কদের নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ও গবেষণার পরিমাণ অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি।
এ বিষয়টি ভারত এবং পাকিস্তানের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তদ্রূপ উল্লেখ্য। ভারতে ফিল্ড মার্শাল মানিক শ কে নিয়ে রীতিমতো খুবই চমৎকার ছবি তৈরি হয়ে গেল। শ্যাম বাহাদুর ছবিটি ভারতের সমাজে সমর নায়কদের সম্মান এবং আদর্শনীয় অবস্থানে তুলে ধরার যে প্রয়াস, তারই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে Popular Culture-এর প্রকাশভঙ্গি আরও ব্যাপক এবং অতুলনীয়। শুধু সিনেমা দেখে একজন সাধারণ মানুষ সামরিক নায়কদের গুণগ্রাহী হয়ে উঠতে পারেন। আমরা ফিল্মের মাধ্যমে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মানবিক দিকটা যতটা আত্মস্থ করেছি, বড় বড় ঐতিহাসিকের প্রসিদ্ধ বই পড়ে ততটা অনুভূতির নাড়া পাইনি।
সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের একটি অনবদ্য প্রতিষ্ঠান হলেও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে যে মানবসম্পদের প্রয়োজন, তারা আমাদের সামাজিক পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ইনস্টিটিউশন হিসেবে এর বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য এবং চরিত্র রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য বহু দিনের চলমান প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার মাধ্যমে এক অনুকরণীয় দক্ষতায় রূপলাভ করে। দেখা যায় যে, শত সমালোচনা সত্ত্বেও সরকার বিপদে পড়লে সামরিক বাহিনীর শরণাপন্ন হতে কুণ্ঠাবোধ করে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রথা ভঙ্গ করে সামরিক বাহিনীর নিয়োগকে দৃঢ় করতে চাচ্ছেন, তা আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংগতিপূর্ণ না হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন এই ব্যবস্থাকে সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের ব্যাপারে মোটেই অন্তরায় বলে মনে করছেন না।
‘সিভিল-মিলিটারি’ শব্দটি বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘নাগরিক-সামরিক’। এর আভিধানিক অর্থ হলো একটি রাষ্ট্রের সরকার এবং সমাজের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক। কিন্তু বস্তুতপক্ষে এই অর্থের একটি প্রকৃত সীমারেখা রয়েছে। সেই সীমারেখাটি সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন জেনারেলদের সম্পর্কের টানাপোড়ানের চরিত্রকে পরিষ্কার করে তুলে ধরে। এজন্য সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের আসল রূপ হলো রাজনৈতিক প্রভুদের সঙ্গে সামরিক জেনারেলদের সম্পর্কের ঘটনা প্রবাহের মিথস্ক্রিয়া। মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। এখানে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ বলতে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বোঝায় না। বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ বলতে পরিষ্কারভাবে বেসামরিক সরকারের সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়।
সেমুয়াল পি হানটিংটান তার বিখ্যাত বই The Soldier and the State-এ এই সম্পর্কের বিভিন্ন জটিল দিক অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার প্রতিপাদ্য বিষয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ তিনি দিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদাহরণের মধ্য দিয়ে যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ভিত্তির পরাকাষ্ঠা এই সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্রে এই সম্পর্ক যত দৃঢ় হবে সেই রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত বেশি মজবুত হবে।
বর্তমানে উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা একটি বহুল আলোচিত গবেষণামূলক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এতেই বোঝা যায় যে, ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা বাহিনী বেসামরিক কাজে নিয়োজিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। বেসামরিক কাজে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততার পজিটিভ এবং নেগেটিভ দুই দিকই রয়েছে।
এখানে তাত্ত্বিক একটা প্রশ্ন করা যেতে পারে। সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কমান্ডার বলতে আমরা কী বুঝি। সামরিক কর্মকর্তা এমন একজন ব্যক্তি যিনি কঠিন নিয়ম এবং আইনশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি তার ঊর্ধ্বতন আদেশের উত্তরে ‘জি’ কিংবা ‘হ্যাঁ’ ইতিবাচক শব্দগুলো ব্যবহার করেন। কিন্তু তিনি এমনো একজন ব্যক্তি যিনি প্রয়োজনবোধে ‘না’ শব্দটি ব্যবহার করার মতো মানসিক সাহস ধারণ করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। এই ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’র মধ্যে যে বৈপরত্য, তার সঠিক সীমারেখা নির্ধারণ করাই একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার পেশাগত উৎকর্ষতার সর্বোচ্চ ধীশক্তি।
কোনো সন্দেহ নেই যে, একজন জেনারেল, অ্যাডমিরাল বা এয়ার মার্শাল তার রাজনৈতিক ঊর্ধ্বতনের আদেশ মানবেন কিন্তু সব সময় যে সেই আদেশ নীতিগতভাবে সঠিক এবং ন্যায়সংগত হবে তা নয়। জেনারেলের দায়িত্ব হলো তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষায়িত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার আলোকে সরকারের কাছে তার যুক্তির অবস্থানটা তুলে ধরা। তাকে অবশ্যই সত্যের পথটা বেছে নিতে হবে, তার জন্য যদি তাকে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়, তা সত্ত্বেও। একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের একটি সম্পদ, শুধু সরকারের আজ্ঞাবহ যন্ত্র নয়।
বিখ্যাত প্রুশীয় সৈনিক এবং দার্শনিক কার্ল ভন ক্লজউইজের বই On War-এ সরকার, জনসাধারণ এবং সামরিক বাহিনীর ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। যদিও তার চিত্রটি তিনি যুদ্ধের সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনা করে এঁকেছেন, তার মডেলটি একটি রাষ্ট্রের শান্তির সময়ের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু সূক্ষ্ম জিনিসটি হলো শান্তির সময়ে সামরিক বাহিনীর ব্যবহার কোনো একটি সরকারের নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থের মুখোমুখি এই বাহিনীর রাষ্ট্রীয় শপথের মহান দায়িত্ব পালনের বিপরীতে সংঘাতের পর্যায়ে পর্যবসিত না হয়। সশস্ত্র বাহিনী প্রধানদের রাজনৈতিক দলগুলোর তাদের ওপর অসাংবিধানিক চাপ প্রতিরোধের মধ্যে প্রমাণিত হয় একটি রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদের চরিত্রের গুণগত বৈশিষ্ট্যের পরাকাষ্ঠা।
গত রাজনৈতিক সরকারগুলোর আমলে সামরিক বাহিনীগুলোকে পোষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। বাহিনীপ্রধানরা অনেক সময় অসহায় বোধ করেছেন, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এসব বাহিনী অধিকতর শক্তিশালী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ে। পুলিশ বাহিনীকে সামরিক বাহিনীর সমকক্ষ করে তুলবার প্রয়াসটি ছিল অত্যন্ত অফলপ্রসূ রাজনৈতিক পরিকল্পনা। পুলিশ বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ করে নিরীহ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহারের রাজনৈতিক কৌশল ছিল মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড।
সামরিক বাহিনীকে পেশাগতভাবে দুর্বল এবং নৈতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু করার রাজনৈতিক চিন্তার চেয়ে অধিকতর ত্রুটিপূর্ণ মানসিকতা জাতীয় জীবনে আর কিছু হতে পারে না। সভ্য সমাজে বন্ধু হিসেবে পরিচিত পুলিশ সদস্যদের দাঁড় করানো হলো জনসাধারণের প্রতিপক্ষ হিসেবে। নিরোধ চৌধুরীর লেখা ‘আত্মঘাতী বাঙালী’র মূল প্রতিপাদ্য ছিল বাঙালি জাতির আত্মহনন। সেই আত্মহননের দ্বারপ্রান্তে আমরা পৌঁছেছিলাম, যদি না সামরিক বাহিনী এবং জনসাধারণের মধ্যে ঐক্যের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টদের পতন না হতো।
কার্ল ভন ক্লজউইজের সেই উক্তিটি ‘সরকার-জনগণ-সামরিক বাহিনীর ত্রৈমাত্রিক সম্পর্ক একটি অকাট্য সত্য’ আজও জাতীয় জীবনে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ব্যাপার। এই সত্যের মর্মার্থ একটি জাতির রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতারা যত গভীরভাবে উপলব্ধি করবেন, সেই জাতির নাগরিকরা তত বেশি ব্যক্তি জীবনে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবেন। নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার আশ্বাস ব্যতিরেকে কোনো জাতিই শান্তিতে থাকতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন সংবেদনশীল রাজনীতিবিদ এবং প্রজ্ঞাবান সামরিক নেতারা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান

