আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৫ বছরের দেশের পুঁজিবাজার থেকে এক লাখ কোটি বা এক ট্রিলিয়ন টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। গত রবিবার অর্থনীতির শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে কারসাজি, প্রতারণা এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও জালিয়াতির মাধ্যমে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তিন মাসের অনুসন্ধান শেষে রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছেন।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের এই কারসাজির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীরা। তারা আইন লঙ্ঘন করে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দর বাড়িয়ে টাকা লুটপাট করেছেন। পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুর্বল কোম্পানিকে ভালো কোম্পানি দেখিয়ে শেয়ারের মূল্য অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি।
এ ছাড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও পদ্ধতির ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, আইপিও প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, কারসাজি, শেয়ার প্লেসমেন্ট এবং প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রভাবশালী উদ্যোক্তা, ইস্যু ম্যানেজার, অডিটর এবং কিছু বিনিয়োগকারী যুক্ত হয়ে পুঁজিবাজারে একটি কারসাজি চক্র তৈরি হয়েছিল বলে শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজার নিয়ে যত তদন্ত প্রতিবেদন করা হয়েছে এবং সেখানে যাদের নাম এসেছে তাদের কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করে শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে করা এক জরিপে ৭১ ব্যবসায়ীর মধ্যে ৫০ শতাংশ ব্যবসায়ী মতামত দিয়েছেন পুঁজিবাজারে সেকেন্ডারি মার্কেটে সন্দেহজনক লেনদেন হচ্ছে। ৫৩ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কারসাজি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া দুর্বল, ৫০ শতাংশ ব্যবসায়ী মতামত দিয়েছেন তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন কারসাজির মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, ২০২২ সালে দুর্বল কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হয়ে পুঁজিবাজারের ভিত্তি নষ্ট করা হয়েছে।
শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়, পুঁজিবাজারে প্রভাবশালী উদ্যোক্তা গোষ্ঠী, ইস্যু ম্যানেজার, নিরীক্ষক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কারসাজির একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বাজারের মধ্যস্থতাকারী (ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক) দেউলিয়া হয়েছে, তাদের ইক্যুইটি ৩০ হাজার কোটি টাকা নেতিবাচক হয়েছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের সূচক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মার্জিন ঋণের অনুপাত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়ে আসছিল। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সূচক অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ইন্ধন দেওয়া হয়েছে। বিএসইসি প্রায়ই শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধিকে উপেক্ষা করে সূচক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। যখনই দাম কমতে শুরু করে, তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকলাপ শুরু হয়। সবচেয়ে বিতর্কিত ফ্লোর প্রাইস পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে পুঁজিবাজারের সুনামকে কলঙ্কিত করেছে। এর মাধ্যমে ভালো কোম্পানির লেনদেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কারসাজিকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
পুঁজিবাজার থেকে ২০২০-২১ সালে বেক্সিমকো গ্রুপ বেক্সিমকো সুকুক বন্ডের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা বা ৩০ বিলিয়ন টাকার তহবিল সংগ্রহ করেছে। এই তহবিল সংগ্রহের সময় বলা হয়, তিস্তা সোলার ও করতোয়া সোলার নির্মাণ প্রকল্প, যা বেক্সিমকো লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বেক্সিমকো টেক্সটাইল সম্প্রসারণে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যয় করা হবে। এই বন্ড ক্রয় করতে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নির্দিষ্ট অঙ্কের বন্ড কিনতে বাধ্য করেছিল বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধাররা।