সচিবালয়ে নজিরবিহীন আগুনের ঘটনায় গঠিত আট সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওই কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রথম দিনের এই বৈঠকের বিষয়ে কমিটির সদস্যরা বিস্তারিত কিছু জানাননি।
বৈঠকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জে. মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা এই বিষয়ে মন্তব্য করার মতো অবস্থা হয়নি।
গত ২৫ ডিসেম্বর বুধবার দিবাগত রাতে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার রাতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আট সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আজ ছুটির দিন হলেও কমিটি সচিবালয়ে গিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করে।
যেভাবে তদন্ত কমিটির কাজ শুরু
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদন্ত কমিটির কার্যপরিধি নিয়ে আলোচনায় বসেন কমিটির সব সদস্য। এর আগে সকাল ১০টার মধ্যে তদন্ত কমিটির সব সদস্য সচিবালয়ে প্রবেশ করেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এক আদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে আহ্বায়ক করে এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালকে সদস্যসচিব করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আইজিপি বাহারুল আলম, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তানভীর মনজুর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রাসেল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইয়াছির আরাফাত খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান।
কমিটিকে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে আদেশে। এরপর পরবর্তী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আদেশে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের উৎস্য ও কারণ উদ্ঘাটন করে এর পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়দায়িত্ব আছে কি না, তা বের করতে বলা হয়েছে। তা ছাড়া ভবিষ্যতে এই জাতীয় ঘটনা প্রতিরোধে এবং সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে বিষয়ে সুপারিশ করতে বলা হয়েছে।
কড়া নিরাপত্তায় সচিবালয়
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সচিবালয়ের সব প্রবেশপথেই কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সচিবালয়ের মূল প্রবেশপথ (১ নম্বর গেট) নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, পুলিশের বিশেষ শাখা এপিবিএনসহ আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সচিবালয়ের ভেতরে এবং বাইরে সেনা, পুলিশ, র্যাব সদস্য ছাড়াও সরকারের সব গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির সদস্য ছাড়া কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি সচিবালয়ে
তদন্ত কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে সচিবালয়ের ১ নম্বর প্রবেশপথে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য জানান, তদন্ত কমিটি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসে। কিছুক্ষণ পর কমিটির সদস্যরা ৭ নম্বর ভবনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে আবার তারা স্বরাষ্ট্রে বৈঠকে বসেন। তিনি জানান, নিরাপত্তার প্রয়োজনে সকাল থেকে তদন্ত কমিটির সদস্য ছাড়া সরকারের যত উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাই হোক না কেন- কাউকেই গাড়ি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
বলার মতো কিছু হয়নি, বললেন ফায়ার সার্ভিসের ডিজি
এদিকে দুপুর পৌনে ১টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সচিবালয় থেকে বৈঠক শেষে বের হওয়ার পথে সাংবাদিকরা তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ড নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা এই বিষয়ে মন্তব্য করার মতো অবস্থা হয়নি। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসেছি। বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছি। তদন্ত সাপেক্ষে বাকি কথা বলা যাবে। তাই এখনো বলার মতো কিছু হয়নি।’
আগামীকাল শনিবার কমিটির সদস্যরা আবার বৈঠকে বসবেন বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক।
বিভিন্ন বাহিনীর বিশেষজ্ঞ দলের কাজ শুরু
কী কারণে আগুন লেগেছে, তা উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে সিআইডি, র্যাব, পুলিশসহ এ-সংক্রান্ত একাধিক বাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল আগুনে পোড়া জায়গাগুলো পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটসহ সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দলও রয়েছে বলে অপর একটি সূত্র জানায়। ঘটনা তদন্ত এবং এর কারণ অনুসন্ধানে সরকারের সব বাহিনী থেকেই বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। আজও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অপরাধ শনাক্তকরণ দল সচিবালয়ের ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ ক্ষতিগ্রস্ত ৭ নম্বর ভবন থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য
এদিকে বেলা ২টার দিকে সচিবালয় থেকে বাইরে আসা নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতার কথা এই প্রতিবেদককে বলেন। সকালে একটি বিশেষজ্ঞ দলের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তিনিও সেখানে ছিলেন বলে জানান। এ প্রসঙ্গে বলেন, আগুনের তাপে অনেক জায়গায় দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। জানালার অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেম, কাচ এমনকি স্টিলের কিছু আলমারিও আগুনের তাপে গলে গেছে। তিনি বলেন, সচিবালয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহের যে তারগুলো রয়েছে তা ভবন তৈরি করার সময় বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সংস্কার করা হয়েছে। এই কাজগুলো সাধারণত সচিবালয়ের নিজস্ব ইলেকট্রিশিয়ানদের দিয়েই করা হয়েছে। ফলে এই তারগুলো কোথায় আছে বা কোন পথে নেওয়া হয়েছে এটা মোটামুটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানেন। কিন্তু সমস্যা মনে হচ্ছে অন্য জায়গায়। গত সরকারের সময় সচিবালয়ের সব ভবনের মতো এই ভবনের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। তখন মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের কক্ষ এবং করিডরে লাইটিংয়ের যে কাজগুলো করা হয়েছে, সেই সব বাইরের ঠিকাদারদের মাধ্যমে করা হয়েছে। ফলে যখন যেখানে প্রয়োজন হয়েছে, সেখান থেকেই সংযোগ নিয়ে বা দিয়ে লাইটিংয়ের কাজগুলো করা হয়েছে। ফলে কক্ষ এবং করিডরে বিদ্যুতের পয়েন্ট যেমন বেড়েছে তেমনই জোড়া দেওয়া স্থান বা সংযোগের সংখ্যাও বেড়েছে। এসবও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, যা একান্তই আমার পর্যবেক্ষণ। তদন্ত কমিটি অন্য কোনো কারণ উদ্ঘাটন করতে পারে। তবে সবকিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর।