আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনায় রয়েছে তিনটি পদ্ধতি- পোস্টাল ব্যালট, অনলাইন ও প্রক্সি ভোট। তবে এ পর্যায়ে প্রক্সি ভোট পদ্ধতিকে সঠিক সময়ে ভোট গ্রহণের উপযুক্ত পদ্ধতি মনে করছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি ভোটাররা সেখান থেকেই ইসির তৈরি করা অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করে তার নির্ধারিত প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রক্সি ভোট দিতে পারবেন।
গত মঙ্গলবার (১১ মার্চ) নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এসব তথ্য সাংবাদিকদের জানান। এ বিষয়ে অংশীজনরা (রাজনৈতিক দল) মত দিলে আগামী সংসদ নির্বাচনেই স্বল্প পরিসরে প্রক্সি ভোট বাস্তবায়ন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। তবে প্রক্সি পদ্ধতির ভোটে বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠবে- এমনটাই মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে থাকা পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি অথবা অফলাইন ও অনলাইন মিক্সড পদ্ধতি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ইসির প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রক্সি ভোট কী?
এই পদ্ধতিতে ভোটার তালিকায় নাম থাকা একজন প্রবাসী বাংলাদেশিকে তার এনআইডি নম্বর দিয়ে ভোটার রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে এই রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। এরপর কোনো দূতাবাসের সহযোগিতা ছাড়াই ইসির ডেভেলপ করা নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে বাকি তথ্য আদান-প্রদান করা হবে।
প্রবাসী যারা এ পদ্ধতিতে ভোটে দিতে চান, তারা প্রথমে ইসির নির্ধারিত ওই অ্যাপে ফেস রিকগনিশনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করবেন। প্রি-রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভোটের আগ্রহ প্রকাশ করবেন। ওই রেজিস্ট্রেশনের সময় তার পক্ষে যিনি ভোট দেবেন, তার এনআইডি ও বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার সময় জানিয়ে দেবে, কারা কারা প্রক্সি ভোট দেবেন। তাদের জন্য আলাদা ভোটার তালিকার প্রয়োজন পড়বে না।
ইসির প্রবাসী এনআইডি নিবন্ধন শাখার পরিচালক মো. আব্দুল মমিন সরকার জানান বলেন, ‘এটা ওয়ান কাইন্ড অব পাওয়ার অব অ্যাটর্নি। যিনি প্রক্সি ভোট দেবেন, তিনি নিজেও ভোট দিতে পারবেন। প্রবাসীরা বিদেশে বসে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন এবং তার পক্ষে একজনকে (তার নির্বাচনি এলাকার) নির্ধারণ করে দিতে পারবেন প্রক্সি ভোটার হিসেবে। এটা এমনভাবে করা হবে, যাতে এলোমেলোভাবে কেউ এটার সুযোগ না নিতে পারে।’
ইসির ভাবনায় কেন প্রক্সি ভোট
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘আমাদের এ-সংক্রান্ত কমিটির ফাইন্ডিং হচ্ছে পোস্টাল ব্যালট কার্যকরী নয়। কারণ প্রবাসীদের জন্য বর্তমানে যে পদ্ধতি আছে ভোট দেওয়ার অর্থাৎ পোস্টাল ব্যালট সিস্টেম, এটি অচল সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে অতীতে বিদেশ থেকে একটি ভোটও কাস্ট হয়নি। গত সংসদ নির্বাচনে দেশে পোস্টাল ব্যালটে ভোট পড়েছে ৪৩৩টি। এই পদ্ধতিতে ব্যালট ছাপানোর পর সময় থাকে ১২-১৫ দিন। অথচ সময় দরকার ৩০-৪০ দিন। ইসির কমিটি পোস্টাল ব্যালট, অনলাইন সিস্টেমে ভোট ও প্রক্সি ভোট- এই তিনটির সুযোগ রেখে প্রস্তাব দিলেও প্রথম দুটি ট্রায়ালের জন্য প্রস্তাব করেছে। আর আগামী নির্বাচনের জন্য প্রক্সি ভোটকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমি বিক্রি করতে পারলে এটা কেন সম্ভব না। আরেকটি হলো অনলাইন ভোটিং। তবে অনলাইন ভোটিং তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তবে এটি বেশকিছু দেশে আছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপিন্স, এস্তোনিয়া এবং মেক্সিকো। পাশাপাশি আমাদের উপমহাদেশে ভারত, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশে পাইলটিং হিসেবে অনলাইন সিস্টেমে করছে। ইউএনডিপির সঙ্গেও আমরা আলোচনা করেছি। তারা বলেছে, এতে অনেকেই সফল হতে পারেনি। ফলে আগের নিয়মে তারা ফিরে গেছে।’
ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি পূরণে এই উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন। প্রচলিত আইন ও নিয়ম, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা, ৩৪টি দেশের ৪৪টি মিশনের মতামত এবং সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করে কমিশন প্রক্সি ভোটের ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী নির্বাচনে প্রবাসীদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে আমাদের প্রক্সি ভোটেই যেতে হবে।’
প্রক্সি ভোট বাস্তবায়নে ইসির অবস্থান তুলে ধরে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘এটিই একমাত্র পদ্ধতি ন্যূনতম সময়ের মধ্যে করা সম্ভব। কমিটি যে রোডম্যাপ সাজেস্ট করেছে এবং কমিশন গতকাল অ্যাপ্রুভ করেছে- তিনটি পদ্ধতি নিয়ে একটা ওয়ার্কশপ করা হবে এ প্রস্তাবের ওপরে। ৭-৮ এপ্রিলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন তাতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টেকনোলজি (এমআইএসটি), নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিটির বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। মধ্য এপ্রিলের মধ্যে তিনটি পদ্ধতির একটি আর্কিটেকচার ডেভেলপ হয়ে গেলে তার পরই অংশীজনের সঙ্গে তারা বসবেন।’
কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
স্থানীয় সরকার নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. তোফায়েল আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, “আমাদের দেশের মানুষ ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’- এমন নীতিতে বিশ্বাসী। প্রক্সি ভোটে নয়। আমি নিজেও প্রক্সি ভোট বিশ্বাস করি না। কারণ আমি একজনকে ভোট দিতে বললাম, আর সে অন্য কাউকে ভোট দিল- এটা রোধ করবেন কী করে? এতে ভোট কেনাবেচাও বাড়তে পারে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে আমরা প্রক্সি ভোটকে রাখিনি। পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিকে কেন তারা সহজীকরণের কথা ভাবছে না! বিশ্বের কয়েকটি দেশে সীমিত পরিসরে প্রক্সি ভোটের প্রচলন থাকলেও পুরোপুরি কার্যকর নয়। আমি মনে করি পোস্টাল ব্যালটই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। তফসিল ঘোষণার পর এক সপ্তাহ আগে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থায় আমি কোনো অসুবিধা দেখি না।’
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রক্সি ভোট বিগত কোনো কমিশনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। আমি মনে করি, প্রক্সি ভোট এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না- আমাদের বিশ্লেষণেও এমনটাই মনে হয়েছে। কারণ আমাদের দেশে এক পরিবারে বাবা, মা ও ছেলেমেয়ের পলিটিক্যাল ভাবনা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। পরিবারে কেউ কাউকে বিশ্বাসও করেন না। যাকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করা হবে, তিনিই ভোট দিচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ অনলাইনে ব্যাংকিং কার্যক্রম, অর্থ লেনদেন পছন্দ করলেও ভোটের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে। ইভিএমের মতো পদ্ধতি বিশ্বাস করেনি। এসব বিবেচনায় কমিশনের প্রস্তাবে আমরা চলমান পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিকে সহজীকরণ, অফলাইন ও অনলাইন মিক্সড পদ্ধতি এবং অনলাইন পদ্ধতির প্রস্তাব রেখেছি। যাতে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটার এবং দেশে থাকার পরও নিজ ভোটার এলাকার বাইরে জরুরি কাজে ভিন্ন এলাকায় অবস্থানকারীরা ভোট দিতে পারেন। ইসির উচিত হবে সংস্কার কমিশনের দেওয়া অফলাইন ও অনলাইন মিক্সড পদ্ধতির যে প্রস্তাব সেটা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা। একই সঙ্গে পদ্ধতিগুলো নিয়ে পাইলটিং করা।’
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বসবাস করছে প্রায় ২ কোটি বাংলাদেশি। ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীদের মাঝে প্রথম এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করে। ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের অনলাইনের ভোটার করে নেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করে ইসি। এ পর্যায়ে মাত্র ৭টি দেশে প্রবাসীদের ভোটার করার কার্যক্রম চললেও, গত ৮ জানুয়ারি আরও ৪০টি দেশের তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।