খসে খসে পড়ছে মাটির ভিটার দেয়াল। বাঁশের বেড়াও নড়বড়ে। টিনগুলো জং ধরেছে। কালবৈশাখী ঝড়ে যেকোন সময় উড়ে যাওয়ার শঙ্কা শতাভাগ। ঘরে আসবাবপত্র বলতে পুরোনো একটি খাট, একটি টেবিল, একটি খাঁচা ফ্যান। দুই ছেলে সন্তানকে কোলে নিয়ে ঘরের চৌকাঠে বসে আছেন তিনি। মাঝেমাঝেই পিঠের ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।
বলছিলাম সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের আকিলপুর গ্রামের যুবক মিজান হোসেনের কথা। যিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বাড়ির পাশের শিপইয়ার্ড ম্যাক করপোরেশনে জীবিকার তাগিদে শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দেন। সেখানে এক যুগ কাজ করার পর তাকে একই কোম্পানীর এ পি এস করপোরেশনে কাটারম্যান হিসেবে বদলী করা হয়। সেখানে কর্মঘন্টার অতিরিক্ত কাজ করেও ন্যূনতম মজুরি পেতেন না তিনি। ওই ইয়ার্ডে কর্মরত অবস্থায় ২০২৪ সালের ১২ মে বিকালে গ্যাসের মাধ্যমে জাহাজ কাটতে গিয়ে প্রায় ২০ ফুট উপর থেকে সাগরের বালুচরে পড়ে যান। এরপর তাকে স্থানীয় বিএসবিআরএ হাসপাতালে নেওয়া হলেও ভালো চিকিৎসা পাননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন মিজান। ক্ষতিপূরণ চাইলেও দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত শ্রম আদালতে মামলা করেও বিশেষ কোনো লাভ হয়নি। একপর্যায়ে দারিদ্রের কষাঘাতে গত বছরের ২৮ আগস্ট মাত্র এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ নিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।
শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ১৫১ এবং তপসীল ৫ অনুসারে জাহাজভাঙা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা অনুসারে মারাত্মক আহত শ্রমিকের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একইসঙ্গে ১ বছরের বেতনসহ ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ও ছুটি দেওয়ার কথা। সেই হিসেবে মিজানের পাওয়ার কথা ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মিজানকে দেওয়া ক্ষতিপূরণ শ্রম আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এরপর দীর্ঘ এক বছর ধরে তিনি বেকার হয়ে ঘরেই দিন পার করেছেন। দুই সন্তান, স্ত্রী, ভাবী, মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যেদের নিয়ে পড়েছেন চরম বেকায়দায়। মিজান ভারী কিছু বহনেও অক্ষম। ঘুমাতে হলে তাকে বেল্ট পরিধান করতে হয়। এখনও মাঝ রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। কবে নাগাদ নিজে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠবেন তাও জানেন না মিজান। ইয়ার্ড মালিকের গাফিলতি আর অমানবিক সিদ্ধান্তে তিনি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
মিজানের সাথে খবরের কাগজের কথা হয় বুধবার (৩০ এপ্রিল) সকালে। তিনি জানান, শিপইয়ার্ড কর্তপক্ষের হুমকি ও তারা প্রভাবশালী হওয়ায় নিজেকে সেই যুদ্ধ থেকে গুটিয়ে নেন। তার এক ভাই সড়ক দূর্ঘটনায় ৬ মাস আগে মারা যান। এতে সংসারের পুরো চাপ তার উপর আসে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তিনি প্রতিদিন চাচার দোকানে সময় দিচ্ছেন। তার দেওয়া সামান্য কিছুতে টানছেন সংসার। বলতে গিয়ে কান্নায় চোখ ভাসান মিজান। বলেন, আমি না মরে বেঁচে আছি। পরিবারকেও মারছি।
মিজানের মা হোসনে আরা বেগম ছলছল চোখে বলেন, এক সন্তান গাড়ি চাপায় মারা গেছেন। আর সন্তান বেঁচেও মরার মতো। শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ তাকে ঠকিয়েছে। আমার ছেলেকে কোন ব্যবস্থা না করে দিয়ে তারা আরামসে ব্যবসা করছে।
মিজানের মতোই গল্প আবু মুছার। তিনিও একই মালিকের ভাইয়ের শিপইয়ার্ডে পাইপ ফিটার বিভাগে কাজ করতেন। শিপইয়ার্ডে তার কাজের অভিজ্ঞতা ১২ বছরের। শিপইয়ার্ডে কাজের একপর্যায়ে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। ৩ বছর আগে দেশে এসে স্থানীয় ম্যাক করপোরেশনের মালিক মাস্টার আবুল কাশেমের ভাই হাশেমের শিপইয়ার্ডে কাজ নেন। হঠাৎ করেই জাহাজের উপর থেকে পড়ে মারাত্মক আহত হন তিনি। তার ডান পা ভেঙে ও থেতলে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন মুছাকে মৃত ভেবে, বাড়ি দূরে বলে ইয়ার্ডে দীর্ঘ সময় ধরে ফেরে রাখা হয়েছিল। পরে প্রথমে চমেক হাসপাতালে নিয়ে মেঝেতে বিনা চিকিৎসায় রেখে দেওয়া হয়। এরপর ক্ষোভে স্থানীয়রা শিপইয়ার্ড ঘেরাও করলে তাকে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার ডান পায়ে দুটি রড ও ১৪ টি স্ক্রু লাগানো হয়। দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় আবু মুছাকে। তিনিও আইন অনুসারে ক্ষতিপূরণ পাননি। দীর্ঘ ৩ বছরের বেশি সময় ধরে তিনিও বেকার। বর্তমানে পরিবার নিয়ে আছেন চরম বেকায়দায়। তবে তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
সীতাকুণ্ডের আকিলপুরে বিয়ে করেন সাতক্ষীরার এই যুবক। তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার স্বামী যখন পায়ে আঘাত পায় তখন আমরা সীমাহীন কষ্টে পড়ে যাই। আমার গর্ভে তখন সন্তান। একদিকে নিজে অসুস্থ, অন্যদিকে স্বামী মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। অবর্ণনীয় কষ্টের সেই দিনগুলি কোনদিন ভুলব না। তিনি বলেন, আমার স্বামী এখনও ক্ষতিপূরণ পায়নি। সামনে তার পায়ের রড়গুলো খুলতে হবে। মালিক খরচ দেবেন বলেছেন। হয়তো চক্ষু লজ্জায় আমার স্বামী কথা বলছেন না গণমাধ্যমে।
জানতে চাইলে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, শিপইয়ার্ড মালিকরা আমাদেরকে একাধিক বৈঠকে শ্রমিকদের নিন্মতম মজুরি বাস্তবায়ন করবে বলে জানালেও আসলে তা করেনি। বছরের পর বছর শ্রমিকরা বঞ্চনার শিকার। তাদের কোন উন্নতি নেই। কর্মঘন্টা বেশি, বেতন কম, নিয়োগপত্র নেই। আহত হলেও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ মিলছে না। ইতিমধ্যে এই শিল্পে ১৫ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। আমরা ডিসির মাধ্যমে শিল্প উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি দিয়েছি।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. শিপন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ৩৫ টি ইয়ার্ড থাকলেও জাহাজ আছে ২৫টিতে। সবকটি ইয়ার্ডে মোট শ্রমিক কাজ করছে আনুমানিক সাড়ে ১০ হাজার। তাদের মজুরি রোয়েদাদ বাস্তবায়ন, ক্ষতিপূরণ আদায়, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ৮ ঘন্টা কর্মঘন্টা ঠিক রাখতে আমরা কাজ করছি। শিপইয়ার্ড গ্রীণ হওয়াতে আগের চেয়ে উন্নতিও হচ্ছে এসব দিকে।
সিফাত/