২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর। এই দিন সকালে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে খুন হন দর্জি দোকানদার বিশ্বজিৎ দাস। বিরোধী দলের কর্মী ভেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী রামদা, কিরিচ ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে একের পর এক আক্রমণ করেন। মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে যায় পুরো শার্ট। নির্মম নির্যাতনে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের শাসনামলে এ ঘটনাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই দিনের ঘটনার প্রতীকী চিত্রায়ণ করা হয়েছে মেট্রোরেলের কারওয়ান বাজার স্টেশন থেকে ফার্মগেটমুখী পিলারে।
শুধু বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড নয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে পিলারগুলোতে।
মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বিকেলে দেখা যায়, পিলারগুলোতে গ্রাফিতি আঁকছেন শিল্পীরা। ২০০৯ সাল দিয়ে শুরু। প্রতিটি পিলারের মধ্যভাগে সালগুলো ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার নিচেই লেখা ‘ফিরে দেখা ফ্যাসিস্ট রেজিম’। পিলারের বাকি তিন দিকে সেই বছরের আলোচিত তিন অনিয়মের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পিলখানা হত্যাকাণ্ড, ক্যাঙ্গারু কোর্ট, খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ, ফেলানী হত্যাকাণ্ড, শেয়ারবাজারের পতন, ইলিয়াস আলীকে গুম, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, সন্ত্রাস, ব্লগার হত্যাকাণ্ড, রিজার্ভ চুরি, হোলি আর্টিজানে হামলা, তনু ধর্ষণসহ ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে।
গ্রাফিতি আঁকার কাজটি তদারকি করছেন শিল্পী সোহাগ খান। তিনি দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন সবাইকে। কোন চিত্রের পর কোনটা আঁকা হবে বলে দিচ্ছেন। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘সরকার যে জুলাই আন্দোলনের বর্ষপূর্তি পালন করবে, তার আগেই গ্রাফিতি আঁকা শেষ হবে। জুলাই উপলক্ষে এটি করা হচ্ছে। আশা করছি আমরা ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে এটা সম্পন্ন করতে পারব। ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে প্রতিবছরের আলোচিত হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো আঁকা হবে। সর্বমোট ৭০ পিলারে এই গ্রাফিতি অঙ্কন করা হবে।’
এই গ্রাফিতি অঙ্কনের পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি একটি লিখিত বক্তব্য দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মূলত এখানে দুটি কার্যক্রম আমরা হাতে নিয়েছি। ১. যেখানে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সব গণহত্যা, দুর্নীতি, অনিয়মগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য সেগুলোর গ্রাফিক আর্টওয়ার্ক করা হচ্ছে। ২. জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের সব কর্মসূচি ও কার্যক্রমকে আমরা এখানে চিত্রায়িত করব, যাতে করে জুলাইয়ের কার্যক্রমকে আমরা স্মরণীয় করতে পারি। এ কার্যক্রম পরিচালনায় উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তারাও সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে এই কার্যক্রমের ব্যয়ভার বহনের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে সহায়তা (স্পন্সর) নিয়েছি। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।’
আরেক শিল্পী শহীদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ৩০-৪০ জন কাজ করছি। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যে অন্যায়গুলো হয়েছে, সেগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। মানুষ যেন সেসব দিনের কথা স্মরণ করতে পারে।’