সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি আজ। আজ পবিত্র জন্মাষ্টমী। সনাতন ধর্মমতে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে পৃথিবীকে কলুষমুক্ত করতে ধরাধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিল। অন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার বাণী লিপিবদ্ধ হয়েছে শ্রীমদ্ভগবদগীতায়, যা হাজার হাজার বছর ধরে মানবজাতিকে পথনির্দেশ করছে বলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন। এদিকে প্রধান উপদেষ্টা জন্মাষ্টমী উপলক্ষে এক বাণীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি প্রতিবছরের মতো দুই দিনের অনুষ্ঠানসূচি গ্রহণ করেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সংবাদ সম্মেলনে দুই কমিটির সদস্যরা সেই আয়োজনের বিস্তারিত তথ্য জানান।
শনিবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ, বেলা ৩টায় ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিল এবং রাতে শ্রীকৃষ্ণপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে আয়োজিত গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন। আজ বেলা ৩টায় রাজধানীর পলাশীর মোড়ে চিরাচরিত ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলের উদ্বোধন হবে। এই ঐতিহাসিক মিছিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. মঈন খান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর এই ঐতিহাসিক মিছিল প্রতিবছরের মতো একই পথ পেরিয়ে পুরোনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হবে। রাতে ঢাকেশ্বরী মেলাঙ্গনে শ্রীকৃষ্ণপূজার পর প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে।
পবিত্র জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান ১৯ আগস্ট মঙ্গলবার বেলা ৩টায় হবে আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করবেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান শ্রী তপন মজুমদার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব। তিনি জানান, সারা দেশে বিভিন্ন মন্দির থেকে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আজ যত শোভাযাত্রা বের হবে, সেগুলোর সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সকালে যারা শোভাযাত্রা বের করবেন তাদের দুপুর ১২টার মধ্যে তা শেষ করতে হবে। আর বিকেলে যারা আয়োজন করবেন, তাদের বেলা ৩টায় শোভাযাত্রা বের করে সন্ধ্যার আগে শেষ করতে হবে।
তিনি জানান, জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানমালায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নিরাপত্তার ব্যাপারে পুলিশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে পূজা কমিটির নেতাদের আশ্বস্ত করেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে পূজা কমিটিগুলো স্বেচ্ছাসেবক দল মোতায়েন করবে। তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা দেবেন।
দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা, নির্যাতন, জবরদখল ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় শঙ্কা ও ক্ষোভ জানান দুই পূজা কমিটির নেতারা। তাদের পক্ষে জয়ন্ত দেব বলেন, ‘অব্যাহত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসে বিপর্যন্ত ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় এই নতুন পরিস্থিতিতে অস্তিত্বসংকটে পড়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র নেতাদের আন্তরিক চেষ্টায় গত কয়েক মাসে সাম্প্রদায়িক হামলার তীব্রতা কমে এলেও পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়নি।’
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার বাণী
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘শুভ জন্মাষ্টমী’ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে বলেছেন, ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রীতির এই বন্ধনকে অটুট রাখতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, সমাজে বিদ্যমান শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে কেউ যেন নষ্ট করতে না পারে সে জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেছেন। তিনি এ সময় ‘শুভ জন্মাষ্টমী’ উপলক্ষে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ধর্মাবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি ‘শুভ জন্মাষ্টমী’ হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। সমাজে সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীকৃষ্ণ আজীবন ন্যায়, মানবপ্রেম ও শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ যেখানেই অন্যায়-অবিচার দেখেছেন, সেখানেই অপশক্তির হাত থেকে শুভশক্তিকে রক্ষার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন।”
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্য। আবহমানকাল থেকে এ দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন।’ শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ও শিক্ষা পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে উল্লেখ করে তিনি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বৈষম্যমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।