২০১৬ সালের কথা। শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এক অনন্য পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। সেটি হচ্ছে মিনি ডাস্টবিন স্থাপন প্রকল্প। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে শুরু হয় ছোট আকারের ডাস্টবিন স্থাপনের কাজ। নাগরিকদের নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার জন্য নগরীর সড়ক ও ফুটপাতের পাশে স্থাপন করা হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ‘মিনি ডাস্টবিন’। কিন্তু চুরি, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে আজ ১০ বছর পর এসে সেই সব মিনি ডাস্টবিনের অস্তিত্ব আর নেই। একেবারে গায়েব হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার দুই সিটিতে স্থাপন করা প্রায় ১১ হাজার মিনি ডাস্টবিনের মধ্যে উত্তর সিটি এলাকায় ছিল সাড়ে ৫ হাজারের কিছু বেশি এবং বাকিগুলো ছিল দক্ষিণ সিটি এলাকায়। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ফুটপাতের পাশে বা সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এই ডাস্টবিনগুলো বসানো হয়। কিন্তু সেগুলোর প্রায় সবই এখন হারিয়ে গেছে। নতুন করে আবারও এই ধরনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে।
গত কয়েক দিন রাজধানীর মতিঝিল, আরামবাগ, গুলিস্তান, আজিমপুর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আগারগাঁও, ফার্মগেট ও উত্তরা এলাকায় ঘুরে মিনি ডাস্টবিনের হদিস পাওয়া যায়নি। একসময় যেসব জায়গায় মিনি ডাস্টবিন ছিল, এখন সেসব জায়গায় চিহ্নটুকুও নেই। কোথাও কোথাও সড়কের পাশে বড় ডাস্টবিন রয়েছে। কিন্তু তারপরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে ময়লা-আবর্জনা।
আলাপকালে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা খবরের কাগজকে বলেছেন, শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার তৎকালীন এই উদ্যোগ নগরবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় যথাযথ তদারকির অভাবে এসব ডাস্টবিন হারিয়ে গেছে। ডাস্টবিনগুলো থাকলে নাগরিকদের সুবিধা হতো। সবাই না ফেললেও কিছু মানুষ তো ময়লা-আবর্জনা ডাস্টবিনেই ফেলতেন। ধীরে ধীরে সবার মাঝেই সচেতনতা তৈরি হতো। দুই সিটি করপোরেশনের অবহেলায় সবই ভেস্তে গেছে।
সচেতন মহলের মতে, প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ জনসচেতনতার অভাব। প্রচারের মাধ্যমে নাগরিকদের সচেতন করা হয়নি। অনেকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করে ডাস্টবিন ভেঙে ফেলেছেন। আবার ফুটপাত দখল করে যারা দোকান বসিয়েছেন, তারাও দুর্গন্ধের কারণে এগুলো নষ্ট করেছেন। অন্যদিকে নেশাখোর বা ভাঙারি পণ্য কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা চোরদেরও নজর পড়েছিল মিনি ডাস্টবিনে। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এসব বিষয়ে কোনো রকম তদারকিও করেনি।
আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক কামরুল হাসান বলেন, ওই উদ্যোগটি ভালো ছিল। কিন্তু সঠিকভাবে তদারকি করা হয়নি। যেসব জায়গায় ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মানুষ ব্যবহার করতে চাননি।
মোহাম্মদপুরের ব্যাংক কর্মকর্তা লায়লা নাহার বলেন, ‘চুরি আর অবহেলার কারণে কোটি কোটি টাকা নষ্ট হলো। নতুন করে আবার এমন প্রকল্প নিলে আগে এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার ছাড়া এমন উদ্যোগ টিকবে না।’
গুলিস্তানের দোকানদার রবিউল আলম বলেন, ‘ফুটপাতে দোকান বসানো মানুষ অনেক সময় ডাস্টবিন ভেঙে ফেলে দিয়েছেন। কারণ সেখানে দুর্গন্ধ হতো। এতে তাদের ব্যবসার ক্ষতি হতো।’
সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বহু দিন ধরেই রুগ্ণভাবে চলছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টনের বেশি কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩ হাজার টনের বেশি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে ফেলা হয় না। মিনি ডাস্টবিন প্রকল্পটি ছিল একটি ছোট উদ্যোগ, কিন্তু সেটি কার্যকর ও স্থায়ী রূপ দিতে পারলে নগরীর পরিচ্ছন্নতায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখত।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, নাগরিকদের সচেতন করা জরুরি। পাশাপাশি স্বচ্ছ জবাবদিহির আওতায়ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে আনা উচিত। প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সঠিকভাবে তদারকি চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের রাজধানীতে যে হারে ময়লা-আবর্জনা ও পরিবেশ দূষণ হয়েছে তার জন্য খালগুলো পরিষ্কার রাখা জরুরি। পাশাপাশি কৃত্রিম যেসব উদ্যোগ নেওয়া হবে তা যেন বৈজ্ঞানিকভাবে হয়, সেদিকও খেয়াল রাখতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজধানীর সাধারণ মানুষের দৈনিক ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য আমরা নানা পরিকল্পনা নিয়েছি। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে দেখতে পারবেন।’ তবে কী ধরনের পরিকল্পনা তা তিনি খোলাসা করেননি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে আমাদের বিকল্প হিসেবে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সিমেন্ট দিয়ে পাখির মতো একটি ডাস্টবিন তৈরি শুরু হয়েছে। চুরি হওয়ার সুযোগ নেই। পরীক্ষামূলকভাবে সায়দাবাদে এই ডাস্টবিন তৈরি হচ্ছে। সফল হলে পুরো দক্ষিণ সিটি আওতাভুক্ত এলাকায় বসানো হবে।’