জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবারও বৈঠকে বসেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রধান উপদেষ্টাসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতার জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের কারণে ১৭ দিনের লম্বা বিরতির পর কমিশনের তৃতীয় দফা বৈঠকের আজ চতুর্থ দিন।
রবিবার (৫ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এ বৈঠক শুরু হয়। এতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতারা অংশ নিয়েছেন।
এর আগে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে দফায় দফায় আলোচনার পরও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে একমত হতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো।
বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানান, আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে চায় কমিশন। এবারের বৈঠকে দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তারা আশাবাদী। তারপরও দলগুলো ঐকমত্যে আসতে না পারলে সনদ বাস্তবায়নে একাধিক পদ্ধতির সুপারিশ সরকারের কাছে কমিশনের পক্ষ থেকে তুলে দেওয়া হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের বৈঠকে চূড়ান্ত সনদে দলগুলোর স্বাক্ষরের তারিখ নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত ঘোষণা, বাস্তবায়ন কমিটি গঠন এবং জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এরপর প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত স্বাক্ষরকারীদের তালিকা এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা। এসব কাজ শেষ করতে কমিশনের হাতে সময় আছে মাত্র ১০ দিন। কারণ ঐকমত্য কমিশনের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ অক্টোবর।
এদিকে গতকাল শনিবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণসহ চূড়ান্ত পর্বের প্রস্তুতি নিয়ে পর্যালোচনা সভা করেছে ঐকমত্য কমিশন। জাতীয় সংসদ ভবনে কমিশন কার্যালয়ের সভাকক্ষে ওই সভায় সামগ্রিক প্রস্তুতিসহ আজকের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের সভায় যেসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে সেগুলো চূড়ান্ত করা হয়। এছাড়া সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিশেষজ্ঞদের দেওয়া মতামত ও পরামর্শগুলো পুনঃবিশ্লেষণ করা হয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় ৮৪টি বিষয়ে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, পিআর পদ্ধতিসহ মৌলিক কয়েকটি বিষয়ে আছে মত-দ্বিমত। তবে ঐকমত্য কমিশন এখন সবচেয়ে বড় সংকটে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে। কমিশনের এবারের বৈঠকের লক্ষ্য দ্রুত সময়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করা। এ পর্যন্ত সাংবিধানিক আদেশ, গণভোট, গণপরিষদ গঠন এবং নির্বাচিত সংসদ-এই চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়নে ‘সাংবিধান আদেশ জারি’ ও ‘গণভোটে’র ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে কমিশন। এছাড়া নতুনভাবে আলোচনা হচ্ছে আপিল বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাবও।
গত ১৫ সেপ্টেম্বরের ঐকমত্য কমিশনের কার্যকালের মেয়াদ এক মাস বাড়ার পর সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পুনরায় বৈঠক শুরু হয়। কমিশনের বৈঠকে সম্প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতার মধ্যে বিশেষজ্ঞদের নতুন পরামর্শ প্রস্তাব সামনে আনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাতে বলা হয়, মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার একটি ‘সংবিধান আদেশ’ জারি করতে পারে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এরপর আদেশটি নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে ‘গণভোট’ করা যেতে পারে। কমিশনের এমন প্রস্তাবেও পুনরায় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে দলগুলো।
কমিশনের সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আগামী জাতীয় সংসদে বাস্তবায়নের পক্ষে বিএনপি। সংবিধানের সংশোধন বা সংবিধানিক আদেশ অন্তর্বর্তী সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ করতে পারবে কি না বা অন্য কোনো উপায়ে এটা করা যায় কি না, এ বিষয়ে সংবিধানের ১০৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। আরও কয়েকটি দলও সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়ার কথা বলেছে।
তবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। জামায়াতে ইসলামী চায়, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশ বা গণভোট। আর এনসিপি এক্ষেত্রে গণপরিষদ গঠনের পক্ষে।
এমন পরিস্থিতিতে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ইস্যুগুলো বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পুনরায় পর্যালোচনা সভা করে কমিশন। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভার্চুয়াল সভা শেষে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাদের দুই ধরনের সুপারিশের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমটি হলো সংবিধান আদেশ; গণভোট আয়োজনের জন্য সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের অভিমত বা উপদেশ গ্রহণ। অপর প্রস্তাবে একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণপরিষদ গঠন, নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা প্রথমেই সংবিধান সংস্কার সভার মাধ্যমে সংবিধান-সম্পর্কিত বিষয়গুলোর সমাধান করবেন।
ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনা অব্যাহত রাখবে তারা। কিন্তু তারপরও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত জুলাই সনদে সব দল স্বাক্ষর করবে কি না তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়েছে। কারণ জুলাই সনদে স্বাক্ষরের জন্য সব দল তাদের দুজন করে প্রতিনিধির নাম জমা দিলেও স্বাক্ষরের ব্যাপারে এখনো অনেকেই দ্বিধান্বিত।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে ঐকমত্য কমিশন। প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘ সফরের আগে পর্যন্ত তিনটি আলোচনা হলেও দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হয়নি।
এলিস/অমিয়/