সমঝোতার প্রায় কাছাকাছি এলেও গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইস্যুতে এখনো আটকে আছে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। এই দুটি ইস্যু হলো গণভোট ও পিআর পদ্ধতি (ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে আসন বণ্টন)।
বিএনপিসহ তার সমমনা দলগুলো নির্বাচনের দিনেই গণভোটের ব্যাপারে অনড় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নির্বাচনের আগে নভেম্বরে জুলাই সনদের বাস্তবায়নে গণভোট চাইছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো খবরের কাগজকে জানাচ্ছে, নির্বাচনের দিনে গণভোটে জামায়াতসহ দলগুলো রাজি হলে সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতির ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত ছাড় দিতে পারে বিএনপি। অন্যদিকে, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি মেনে নেওয়া হলে জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্য দলগুলো নির্বাচনের আগে গণভোটের অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে। তবে দুই পক্ষের এই ‘ছাড়ের’ বিষয়টি সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে। জানা গেছে, গণভোটের বিষয়ে জামায়াতসহ দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে বিএনপির এখনকার অবস্থান হলো, তারা পিআর পদ্ধতিরই বিপক্ষে।
তবে দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের মধ্যেই আগামী ১৫ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হবে। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো এতে যোগ দেবে।
যতদূর জানা গেছে, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ সব দলই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে। তবে স্বাক্ষরের আগে সব ইস্যুতে ঐকমত্য না হলে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি সরকারের কাছে ছেড়ে দেওয়া হবে। বিশেষ করে গণভোট কবে হবে সেই বিষয়টি সরকারের ওপর ছেড়ে দিতে চায় ঐকমত্য কমিশন।
অবশ্য সমঝোতার জন্য আরও চার দিন সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ঐকমত্য কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হতে পারে। ওই আলোচনার ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জন্য মধ্যপন্থি কয়েকটি দল কাজ করছে। ইতোমধ্যে দলগুলো অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও শুরু করেছে। তারা জুলাই সনদ প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে কিছুটা ছাড় দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি মেনে নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপির মধ্যে আলোচনা আছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে দলটি ইতোমধ্যে অনেক ইস্যুতে ছাড়ও দিয়েছে। তবে গণভোটসহ অনেক ইস্যুতে অন্য দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে বিএনপি বিষয়টি প্রকাশ করেনি। সমঝোতার আগেই এ বিষয়ে আলোচনা তুললে দলগুলো আরও অনেক ইস্যু সামনে নিয়ে আসতে পারে বলে তারা মনে করছে। ফলে ওই দলগুলোর কাছ থেকে ছাড়ের বিষয় বুঝে শেষ পর্যন্ত তারা ছাড়ের কথা বিবেচনায় নেবে। সে ক্ষেত্রেও অন্য দলগুলোর ছাড় দেওয়ার মনোভাব ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তারা দেখতে চাইছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল বলেছেন, ‘নভেম্বরে গণভোট সম্ভব কি সম্ভব না- এটা আলোচনার বিষয় না। আলোচনার বিষয় যতটুকু ঐকমত্য হবে তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যতটুকু ঐকমত্য হবে, তার মধ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। তার বাইরে তো প্রত্যেক দলের অনেক কিছু আছে, যেগুলোতে ঐকমত্য হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপিরও অনেক ইস্যু আছে যেখানে ঐকমত্য হয়নি। আমাদের কোনো অসুবিধা নেই, আমরা তো মেনে নিয়েছি। আর যে বিষয়ে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো আগামী নির্বাচনের পর সমাধান হবে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের অল্প সময় বাকি আছে। এর আগে গণভোটের মতো মহাযজ্ঞ আয়োজন করা সম্ভব নয়। আগে গণভোট করার প্রস্তাব জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার প্রয়াস হবে।
বিএনপির সূত্র জানায়, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির জন্যই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট নেওয়ার প্রস্তাব দেয় বিএনপি। গণভোটের ‘হ্যাঁ বা না’ ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে এবং বাস্তবায়ন করবে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হলে একই আয়োজন, একই অর্থ ব্যয়ে করা সম্ভব বলে মনে করে দলটি।
জানা গেছে, ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে জুলাই সনদ। কিন্তু এই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে মতবিরোধ। দুই ভাগে বিভক্ত দলগুলো।
বিএনপির মতোই জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট দেওয়ার পক্ষে মত তুলে ধরে ১২-দলীয় জোট, গণতন্ত্র মঞ্চে ৬ দল, বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, খেলাফত মজলিস। আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বলছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অপ্রয়োজনীয়। অপর দিকে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কিছু দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়। গণভোটের প্রশ্ন কী থাকবে, ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে- এসব প্রশ্নেও সুরাহা হয়নি।
১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হলে কোনো সমস্যা হবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারদের তিনটি ব্যালটে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভিন্ন দিনে গণভোট হলে ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে। এতে আটকে যেতে পারে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। যদি কোনো কারণে ভোট বিপক্ষে যায় তাহলে ফ্যাসিস্টরা ফিরে আসার সুযোগ পাবে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের খবরের কাগজকে বলেন, জুলাই সনদের আইনি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া বিষয়গুলোর সমাধান হওয়া জরুরি। আমি মনে করি, জুলাই সনদ নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এখন গণভোট অপ্রয়োজনীয়। ঐকমত্য বলতে যতটুকু সবাই একমত হয়েছি, এটাকে ঐকমত্য ধরে এগোলে সমস্যার সমাধনের পথ সহজ। যেগুলো এখন বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে তা বাস্তবায়ন করা দরকার এবং সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলো আগামী সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, এর বাইরে গিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া এবং ঘোরতর দ্বিমতের বিষয়গুলো গণভোটের পদক্ষেপ নতুন সংকট তৈরি করবে। সনদ বাস্তবায়ন জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার। জনগণের ওপর সবাইকে ভরসা রাখতে হবে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানে ঐকমত্য হলেও এখনো সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলের ভিন্নমত অব্যাহত আছে। আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করে দেখেছি, উচ্চকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে পিআর যদি বিএনপি মেনে নেয় তাহলে সমাধান সহজ হবে। আমরা আশা করছি, শেষ মুহূর্তে হলেও বিএনপি এ ব্যাপারে নমনীয় হবে।’
নির্বাচনের আগে গণভোট চায় জামায়াত-এনসিপিসহ চার দল
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট চায় জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলগুলো মনে করে, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আলাদা বিষয়। তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে নভেম্বরের শেষ দিকে গণভোট হতে পারে। অতীতে রেকর্ড আছে, বাংলাদেশে ১৯ দিনের ব্যবধানেও গণভোট হয়েছে, এক মাসের ব্যবধানেও গণভোট হয়েছে। নভেম্বর মাঝামাঝি গণভোট হলে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পরও এক মাস সময় পাবে সরকার। আর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট সময় থাকবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যারা করতে চাইছে তারা মূলত সংস্কার প্রক্রিয়া বানচাল করতে চাইছে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হলে জটিলতা তৈরি হবে। অনেক ভোটার বুঝতে পারবে না কোনটা জাতীয় নির্বাচনের ভোট, কোনটা গণভোট? নানা গোলযোগ সৃষ্টি হতে পারে।’
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই সনদ স্থায়ী বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণপরিষদ নির্বাচনের কথা বলেছিলাম। নতুন সংবিধান প্রয়োজন। নির্বাচনের দিনে গণভোট হলে জুলাই সনদের গুরুত্ব কমে যাবে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা যাবে। এতে সংঘর্ষ-হানাহানিমুক্ত নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে। তা না হলে আগের মতোই নির্বাচন হবে।’
তিনি বলেন, ‘ছাড় দেওয়ার মনোভাব সব দলের থাকতে হবে। রাজনীতির আগের সিস্টেমের পরিবর্তন দরকার। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমের পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর- এমন কোনো কিছু ছাড় দেওয়া যাবে না।’
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো আশঙ্কা দেখছেন না সামান্থা শারমিন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কমিশন অসাধ্য অনেক কাজ শেষ করেছেন। আশা করছি, কমিশন বাকি কাজও শেষ করে জুলাই সনদের স্থায়ী সমাধান করবে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সংস্কার হয়েছে কিন্তু স্থায়ী অনুমোদন না হওয়া জনগণ সুফল পায়নি।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সনদের সংস্কার প্রস্তাবে দলগুলো ঐকমত্য হয়েছে। কিছু প্রস্তাবে ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু জুলাই বাস্তবায়নের দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের। এখন সনদ বাস্তবায়নে আইনি প্রক্রিয়া ঠিক করবে সরকার। যদি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যর্থ হয় তাহলে এর প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়বে।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের দিনে গণভোট হলে জুলাই সনদে আগ্রহ থাকবে না। অনিয়মের অভিযোগে কোনো ভোট কেন্দ্রে যদি ভোট বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কি হবে? জুলাই সনদে বাস্তবায়নে সরকার যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করবে আমরা ইতিবাচক ভাবে দেখব।’