মঞ্চে একটি মাত্র চেয়ার, একটি টেবিল, টেবিলের উপরে ফুলদানিতে রাখা সাদা ফুল। কিন্তু যার জন্য এই আয়োজন সেই চেয়ার ফাঁকা, ফিরে আসবেন না আর তিনি। শ্রদ্ধাভরে এমনই এক নিস্তব্ধ পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রয়াত ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে স্মরণ করলেন তার সহপাঠী-সহকর্মী ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করেছে তার কৃতকর্মের, যেন অনেকটা হীরকখণ্ড ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল, অনেক সাধারণ বিষয়কে তিনি পরিণত করেছিলেন অসাধারণে। হয়ত তিনি তার সেই কর্মের কারণেই যুগের পর যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এ স্মরণ সভায় অংশ নেয়াদের বক্তব্যে এমন প্রত্যাশার কথা উঠে আসে।
সভায় অংশ নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রয়াতের শিক্ষার্থী ও ইংরেজি অধ্যাপক তাহমিনা আহমেদ বলেন, ‘সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে মরণশীল মানুষকে অমর করতে। স্যার চলে গেছেন, তাকে অমর করতে কোন সম্মরণ সভা, কবিতা লেখার দরকার নাই। কারণ তিনি এমন মানুষ ছিলেন যেসব মানুষের জীবনে তার একটুখানি ছোঁয়া আছে, সেই ছোঁয়া অনেক গভীর। আমি আজীবন অবাক হয়ে দেখেছি, স্যার এমন একজন মানুষ ছিলেন, একটি সাধারণ জিনিসকে অনেক অসাধারণ করে তুলতে পারতেন তিনি। অনেক আদর করতেন তিনি, আমরা বিশ্বাস করতাম তিনি হয়ত আমাদের কাছে বিশেষ।’
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘২০১২ সালে আমি যখন বিভাগীয় চেয়ারম্যান হলাম, তখন প্রয়াত চার শিক্ষকের স্মরণসভা করতে চাইলাম। সবাই তিনজন শিক্ষকের স্মরণ সভা আয়োজনের কথা বললেও একজনের কথা কেউ বলছে না। সবাই তো সবাইকে পছন্দ করেন না, এমন সময় স্যার আমার কাছে আসলেন; বললেন মুন্নী, আমি তার কথা বলব। তিনি এমনভাবে স্থাপন করলেন, যে একটা সাধারণ জিনিসকে অসাধারণ করে তুললেন। মনে হলো, তার চেয়ে অসাধারণ শিক্ষক নেই। স্যার স্টেজ থেকে নেমে আসলেন, তখন আমি স্যারকে বললাম, আমার স্মরণসভায় কিন্তু এভাবে কথা বলবেন; স্যার, আমাকে বললেন, পাগল কোথাকার! কখনও ভাবিনি, স্যার এভাবে আমার আগে চলে যাবেন, কিন্তু কি করার; যেতে তো হবেই, সবাইকে!’
সহপাঠী অধ্যাপক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে ৭৩ সালে অনার্স এবং ৭৪ সালে এমএ শেষ হয়। একই হলের ছাত্র হওয়াতে আমাদের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছিল। বন্ধুর পাশাপাশি আমরা ছিলাম সহকর্মী, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা ক্লাস নিয়েছি। মনজুর আমার অকৃত্রিম বন্ধু না, আমার পরিবারের একজন সদস্য ছিল। খুব কাছ দেখেছি, তার প্রতি কাজে আন্তরিকতা ছিল। প্রিয় এই বন্ধুর প্রতি আজন্ম ভালবাসা রইল।’
সকলের স্মৃতির মধ্যে থাকবেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম উল্লেখ করে দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এমন একজন মানুষ ছিলেন, সবাইকে আপন করে নিতেন পারতেন। একজন ভালবাসায় ভরা মানুষ ছিলেন তিনি। গত ১ বছর ধরে তিনি চুপ ছিলেন, তাকে গল্প লিখতে বললাম তিনি আমাকে বললেন, তিনি গল্প লিখতে পারছেন না। বললেন, সাজ্জাদ আমার মধ্যে সক্রিয়তা কাজ করছেন না। শুধু ক্লাস রুমের মানুষ হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম না, যেসকল মানুষ তার সংস্পর্শে এসে বড় হয়েছেন, সবার স্মৃতির মধ্যে তিনি রয়েছেন।’
প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘সৃষ্টিশীল মানুষেরা কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তার কাজের মধ্যে আছেন এবং থাকবেন।’
মনজুরুল ইসলামের মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমার অনুজপ্রতিম ছিলেন। তিনি একজন নক্ষত্র, শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনকে তিনি আলোকিত করেছেন। কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত; সকলকে মৃত্যু স্পর্শ করবে আমি জানি কিন্তু সৈয়দ মনজুরুল ইসলমের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারিনি, যাদেরকে তিনি ভাসিয়ে গেলেন, কাঁদিয়ে গেলে তাদের মধ্যে আমি একজন। আমি মনজুরুল ইসলামসহ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি মঙ্গল কামনা করছি।’
ছাত্র-শিক্ষক হিসেবে মনজুরুল ইসলামের শিক্ষক হিসেবে চমৎকার সম্পর্ক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর। প্রয়াত ছাত্রের স্মরণ সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল অন্যরকম। শুরুতে তিনি আমার ক্লাসের ছাত্র, ছাত্রজীবনের সেই চৌকাঠ মাড়িয়ে শিক্ষকতায় এসে আমার সহকর্মী হয়েছেন। তিনি শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অসামান্য। অনেক শিক্ষক ভালো শিক্ষক হলেও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন না। সেই জায়গায় মনজুর ছিল অনন্য, তিনি ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে পারতেন যেন ছাত্ররা তাদের দূর্বল দিক কাটিয়ে উঠতে পারে। মনজুরের বাবাও খ্যাতিবান শিক্ষক ছিলেন, সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে, তিনি নিজেকে আরও বেশি প্রসারিত করেছিলেন। কেবল যে শিক্ষক ছিলেন তা নয়, মনজুর সাহিত্যিক ছিল। তার সাহিত্য চর্চা অত্যন্ত উন্নতমান ছিল। তাকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দিয়েছে, রাষ্ট্র তাকে একুশে পদক দিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপকের পদ দিয়েছে। এগুলো সবই মধ্যে তার প্রাপ্য ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘তার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে যখন নানান অসুখ ধরা পড়ল, কখনোই সে আমাকে অসুখের কথা বলেনি, বিষণ্ণতার কথা বলেনি। যখন বিদেশে ছিল, চিঠিপত্রে যোগাযোগ হতো কিন্তু কখনোই আমাকে কিছু বলেনি। মনজুরুল ইসলামের যে মৃত্যু সেটি আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না কিন্তু এটি সত্য তিনি আমাদের সঙ্গে ছিল এবং সেটি আমাদের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাদের সঙ্গেই থাকবে, আমাদের স্মৃতিতে অনুভূতিতে এবং তার কাজের মধ্যে।’
এছাড়া ওই স্মরণ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, অধ্যাপক ড. ফকরুল আলম, অধ্যাপক ছদরুল আমিন, অধ্যাপক আহসানুজ্জামান, নৃত্যকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনিরা পারভীন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুল উলায়ীসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন।
এর আগে গত ৩ অক্টোবর অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম রাজধানীর ধানমন্ডিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে (ইউল্যাব) যাওয়ার পথে গাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে গাড়িচালক একজনের সহায়তায় তাকে পার্শ্ববর্তী একটি হাসপাতালে নেন। সেখান থেকে তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে মারা যান তিনি। পরদিন বিকেল মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইয়েটসের কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের দর্শনের প্রভাব’ বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৬) এবং একুশে পদক (২০১৮)।
আরিফ জাওয়াদ/এসএন