পাইকারি পর্যায়ে আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও ভোক্তাদের খুচরায় তা ১২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ৭০ টাকার নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিভিন্ন বাজারে খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। সারা দেশে আমন ধান কাটার পর খেত ফাঁকা হয়ে গেছে। তারপরও বাজারে ১ টাকাও কমেনি চালের দাম। ডিমের দামও পাইকারিতে কমে ৯১ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। তবে ভোক্তাদের খুচরায় গুনতে হচ্ছে ১২০ টাকা। একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজার। এমন অবস্থায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ট্রাকসেলে ভর্তুকিমূল্যে চাল, ডাল, চিনি, সয়াবিন তেল, গায়ে মাখার ও কাপড় কাচার সাবান বিক্রি কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে সরকার। ভোক্তাদের অভিযোগ বাজারে কারসাজি হচ্ছে। নেই কোনো অভিযান। যে যার মতো পণ্য বিক্রি করছে। ফলে সাধারণ মানুষ একেবারে বিপাকে পড়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশে গত নভেম্বর থেকে অনেক বেড়ে গেছে পেঁয়াজের দাম। কেজি ১৬০ টাকায় ঠেকে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার গত সপ্তাহে প্রতিদিন দেড় হাজার টন আমদানি করার অনুমতি দিয়েছে। তারপরও কমছে না দাম।
গতকাল বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা, নতুন মুড়িকাটা ৭০ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু খুচরায় ভোক্তাদের অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। দেশি পেঁয়াজ ১৪০ টাকা, মুড়িকাটা ১০০ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ১২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।
পেঁয়াজের দামের ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের মো. অলি হোসেন, মো. রনিসহ কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাইকারিতেই বেশি দাম। সেখানে না কমলে আমরা কম দামে বিক্রি করি কীভাবে? আগে বেশি বিক্রি হতো লাভও বেশি হতো। কিন্তু দাম বাড়ার কারণে বিক্রি কমে গেছে। লাভও আগের মতো হয় না।’ পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার কম করে পেঁয়াজ আমদানি করছে। এ জন্য কমছে না দাম।
মোকাম থেকে দেশি পেঁয়াজের দাম বেঁধে দিচ্ছে। এ জন্য আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারি না। এ ব্যাপারে শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মনে করেছিলাম পেঁয়াজ আমদানি হলেই দাম কমে আসবে। কিন্তু সরকার বেশি করে আমদানির অনুমতি দেয়নি। দিনে মাত্র দেড় হাজার টন আমদানির অনুমতি দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে না বাজারে। এ জন্য দামও কমছে না। গতকাল নতুন পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি, নতুন মুড়িকাটা ৭০ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়।’ কৃষি মার্কেটের কালু বেপারিও একই কথা বলেন।
গতকাল টাউন হল বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাহিদুর রহমান নামে এক ভোক্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজব দেশ আমাদের। দেখার কেউ নেই। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখনো দেশি পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকায়। টমেটোসহ অনেক সবজি এখনো ১০০ টাকার ওপরে কিনতে হচ্ছে। সিন্ডিকেট চক্রের জালে সব নিয়ন্ত্রণহীন।’
১ টাকাও কমেনি চালের দাম
পৌষ মাস শুরু হয়েছে। সারা দেশে খেতের আমন ধান কাটা হয়ে গেছে। এ ছাড়া চাল আমদানিও হচ্ছে। তারপরও ১ টাকা কমেনি চালের দাম। ভরা মৌসুমেও মোটা চাল (গুটি স্বর্ণা) ৫০ থেকে ৫২ টাকা ও আটাশ চাল ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাগর, মনজুর, আকিজ অ্যাসেনশিয়াল, রশিদসহ অন্য কোম্পানির মিনিকেট চাল চড়া দামেই ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মোজাম্মেল, ডায়মন্ডসহ আরও কিছু কোম্পানির চাল ৮৫ টাকার কমে মেলে না। আতপ চাল বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এ ব্যাপারে কৃষিমার্কেটের পাইকারি চাল বিক্রেতা শিপন মিয়া বলেন, ‘অবাক লাগছে। মোটা চালের এখন ভরা মৌসুম । তারপরও কমছে না দাম।’ কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আ. আওয়ালসহ অন্য খুচরা চাল বিক্রেতাদেরও একই অভিযোগ। ‘খেতের ধান ওঠা শেষ হলেও মিল থেকে ছাড়ে না নতুন চাল। এ জন্য দাম কমে না। তাদের ধরলে বা মিলে অভিযান চালালেই কমবে চালের দাম।’
এখনো ১০০ টাকার বেশি কিছু সবজি
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে শীতের সবজি উঠেছে। আগের তুলনায় সরবরাহও বেড়েছে অনেক। বাঁধাকপি ও ফুলকপির পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মুলার কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ঢ্যাঁড়শের কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা; বরবটি, কচুরলতি ৮০ টাকায় স্থির হয়ে আছে। কিন্তু এখনো বেগুনসহ অনেক সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গতকালও বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শিম ৬০ থেকে ১০০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়।
খুচরায় বেশি দামে ডিম বিক্রি
ডিমের দাম আগের তুলনায় কমেছে। খুচরা পর্যায়ে কমে সাদা ডিম ১০৫ টাকা ও লাল ডিম ১১০ থেকে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তেজগাঁও আড়তে পাইকারিতে আরও কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারের মো. হানিফ মিয়াসহ অন্য পাইকারি ডিম বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেশ কিছু দিন ধরে ডিমের দাম কিছুটা কম। তবে গত তিন দিন দাম আরও পড়ে গেছে। গতকাল লাল ১০০ ডিম ৭৬০ টাকা বা ডজন ৯১ টাকা এবং সাদা ১০০টি ডিম ৭২০ টাকা বা ডজন ৮৬ টাকায় বিক্রি হয়।’ বর্তমানে বিয়েশাদি. পিকনিক তেমন একটা না থাকায় ডিম ও মুরগির দাম কম বলে জানান তারা।
গতকাল বিভিন্ন বাজারে সোনালি মুরগির কেজি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা ও ব্রয়লার মুরগি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ ভালোই আছে। কিন্তু বিক্রি কম। এ জন্য দামও বাড়ে না। বাজারে নদী, খাল, বিলের মাছ পাওয়া গেলেও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ, তেলাপিয়া, কই মাছও ২০০ টাকার কমে মেলে না।