প্রতি বছর বজ্রপাতে হাওরাঞ্চলে প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সন পর্যন্ত ২ হাজার মানুষ মারা গেছেন এই দুর্যোগে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিরাপদের তথ্য বলছে, বজ্রপাতে হাওরাঞ্চলের ৫০ শতাংশ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রতি বছর। এক জরিপে অংশ নেওয়া হাওরবাসীর ৩২ শতাংশ বলেছেন, বার্তা পেলেও তারা নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে পারেন না।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ব্রিজিং সায়েন্স উইথ কমিউনিটিস: ডেভেলপিং কমিউনিটি-বেইজড লাইটেনিং আরলি ওয়ার্নিং সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের সভায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রতিরক্ষা সচিব মো. আ আশরাফ উদ্দিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হকোন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন, ইউরোপিয়ান সিভিল প্রটেকশন অ্যান্ড হিউমেটেরিয়ান এইড অপারেশনস (ইকো)-র প্রতিনিধি মুকিত বিল্লাহ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে হাওরে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নানা তথ্য উপস্থাপন করেন ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ মো. আবুল কালাম মালিক ও বেসরকারি সংস্থা নিরাপদের কর্মকর্তা কাজী শহিদুর রহমান।
এই দুই গবেষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বজ্রপাতের সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৬২ শতাংশ ঘটনা মে মাসে ঘটে; জুন মাসে ঘটে ২৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ ঘটনা। আগস্ট মাসে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে ২১ দশমিক ৪২ শতাংশ।
বজ্রপাতের ভয়াবহতা তুলে ধরে মো. আবুল কালাম মালিক বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঝলকানির সময় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপাদন হয়। সূর্যতাপ যখন ভূপৃষ্টে এসে পড়ে, তার চেয়ে প্রায় প্রায় ৫ গুণ বেশি এই তাপমাত্রা। এ সময় ৩০ কোটি ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। আর আমাদের ঘরবাড়িতে ২২০ ভোল্ট বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়।’
প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়, হাওরে যারা বজ্রপাতের আগাম বার্তা পান তাদের মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ বার্তা অগ্রাহ্য করেন। সাড়ে ৫ শতাংশ মানুষ হাওরে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। জরিপে অংশ নেওয়া ১১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা দেরিতে বার্তা পান। ৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, বজ্রপাতের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরে তারা ১০ থেকে ৩০ মিনিট সময় পান নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে।
জরিপে উঠে এসেছে, প্রতি বছর হাওরের ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বজ্রাঘাতে হতাহত হন। ১৭ দশমিক ১ শতাংশ মাঠের ফসল নষ্ট হয় ও গবাদিপশু প্রাণ হারায়।
অনুষ্ঠানের আলোচকরা বলেন, বাংলাদেশে প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত একটি গুরুতর প্রাকৃতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও খোলা এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠী এ ঝুঁকির সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি-ভিত্তিক বজ্রপাত আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন তারা।
প্রথম ধাপে হাওরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং অংশীদারি নানা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা এবং বজ্রপাত বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্ধারণ করতে হবে। মোবাইল মেসেজ, কল, মসজিদের মাইক, সংকেত পতাকার মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিতে, কারা বেশি ঝুঁকিতে আছে এবং কীভাবে খবর পৌঁছানো যাবে- এসব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
জয়ন্ত/মেহেদী/