দেশের উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। সারা দেশে তাপমাত্রা কমতে থাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
গত কয়েক দিনের ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো শীতে উত্তরবঙ্গের দরিদ্র ও অসহায় মানুষেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, গঙ্গাধর ও ধরলা নদীর তীরবর্তী চর এলাকার মানুষ বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন। শীতবস্ত্রের অভাব ও আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ৯টায় পাওয়া আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রাজশাহীতে ১০ দশমিক ৪, রংপুরে ১১ দশমিক ২, ময়মনসিংহে ১১ দশমিক ৫, দিনাজপুরে ১১ দশমিক ৫, সৈয়দপুরে ১১ দশমিক ৪, তেঁতুলিয়ায় ১১ দশমিক শূন্য, কুড়িগ্রামে ১১ দশমিক ৪ এবং চুয়াডাঙ্গায় ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ জামিনুর রহমান জানান, জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিন ছিল ৯ ডিগ্রি। এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ।
কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ব্রহ্মপুত্র ঘাটের মাঝি শাহ আলম জানান, ঘন কুয়াশার কারণে নৌকা চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দুই দিন ধরে তার কোনো আয়-রোজগার নেই।
তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু শীতবস্ত্র বিতরণ করা হলেও চরের অনেক মানুষের কাছে তা এখনো পৌঁছায়নি। তীব্র শীতে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
পঞ্চগড়ে ঘন কুয়াশায় বেড়েছে শীতের দাপট
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে দিন ও রাতের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে। তবে ঘন কুয়াশার কারণে বাতাসে শীতের দাপট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ফলে বেড়েছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।
শুক্রবার সকাল ৯টায় তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভোর থেকেই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা। সকাল ১০টার পরও চারপাশে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করে। টানা চার দিন ধরে ঠিকমতো সূর্যের দেখা মিলছে না।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কিছু সময় সূর্যের মুখ দেখা গেলেও তাপ ছড়ানোর আগেই আবার কুয়াশায় ঢেকে যায় আকাশ। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার দাপট আরও বেড়ে যায়। রাতভর শিশিরের মতো টিপটিপ করে ঝরে কুয়াশা। ঘন কুয়াশার প্রভাবে সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকার হাটবাজারে মানুষের চলাচল কমে গেছে। দিনের বেলাতেও মহাসড়ক ও সড়কে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৯টায় তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার এই তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে
২২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
হাড় কাঁপানো শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাদের দৈনিক আয়ও কমে গেছে। রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইকচালকদের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
জেলা শহরের ইজিবাইকচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, পেটের দায়ে প্রতিদিন ভোরেই রাস্তায় নামতে হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে যাত্রী কম। আগে দিনে ৬০০-৭০০ টাকা আয় হতো, এখন সারা দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করতেই কষ্ট হয়ে যায়।
একই কথা বলেন জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগর এলাকার পাথর শ্রমিক মনসুর আলী। তিনি বলেন, ‘ঘন কুয়াশার সঙ্গে কনকনে শীত। শীতকালে অনেক কষ্ট হয় কাজ করতে। আমরা ঠিকমতো কাজকর্ম করতে পারছি না। এদিকে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, আগামী সপ্তাহের শুরু থেকে অথবা মাঝামাঝি সময়ে জেলায় দ্বিতীয় দফায় মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত চুয়াডাঙ্গার জনজীবন
সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়েছে। হাড়কাঁপানো শীত, ঘন কুয়াশা ও উত্তরের হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জেলার স্বাভাবিক জনজীবন। আজ শুক্রবার সকালে চুয়াডাঙ্গায় চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রচণ্ড এই শীতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষ। জীবিকার তাগিদে কনকনে ঠাণ্ডা উপেক্ষা করেই কাজে বের হতে হচ্ছে তাদের। শীতবস্ত্রের অভাবে অনেককে রাস্তাঘাটের মোড়ে মোড়ে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। তীব্র শীতের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচলও কমে গেছে।
এদিকে হাড়কাঁপানো শীতে দুর্বিষহ অবস্থায় থাকা অসহায় মানুষজন স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।