চলতি মাসেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৫৭৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্তের পরিমাণ।
রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৪৫২টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্ট চেক প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ বলছে, জানুয়ারিতে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৮১ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৫৬টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১৪টি, খেলাধুলা বিষয়ে ১৪টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১২টি, বিনোদন বিষয়ে ৯টি এবং শিক্ষা বিষয়ে ১টি ও প্রতারণা বিষয়ে ২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।
এসব ঘটনায় তথ্য কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ৩৩২টি। এছাড়া ভিডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১৯২টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৫৩টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ৪১৯টি, বিকৃত ১২৩টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৩৪টি, আংশিক মিথ্যা হিসেবে ১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার টিমের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে ৪টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। ভুল তথ্যগুলোর ধরণ বুঝতে এগুলোকে রিউমর স্ক্যানার দুইটি আলাদা ভাগে ভাগ করেছে৷ সরকারের পক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে ইতিবাচক এবং বিপক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এসব ভুল তথ্যের সবগুলোতেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জানুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ১৩টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। সবগুলোতেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে জড়িয়ে ৬টি, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে জড়িয়ে ৪টি এবং মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, এম সাখাওয়াত হোসেন, শেখ বশিরউদ্দীনকে জড়িয়ে ২টি করে ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও শারমীন এস মুরশিদকে জড়িয়ে ১ টি করে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকে জড়িয়ে ১টি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজকে জড়িয়েও ২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার জানুয়ারি মাসের ফ্যাক্ট চেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে জানুয়ারিতে ২৩৮টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১৫৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ২৫টি অপতথ্য (৯৬ শতাংশই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ২০টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৩৮টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ৮৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৬২ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ৬০টি অপতথ্য (৭২ শতাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদলকে জড়িয়ে এই সময়ে ৯টি ও যুবদলকে জড়িয়ে ১টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, জানুয়ারি মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৫৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে ৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার সবগুলোতেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়েও ৯টি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে জানুয়ারিতে ৯৮টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ২৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে যার প্রায় ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে ৪১টি অপতথ্য (৯০ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে ২টিসহ এই বাহিনীকে নিয়ে ১৪টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলমকে জড়িয়ে ১টিসহ বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ১৮টি এবং র্যাবকে জড়িয়ে ২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
জানুয়ারিতে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ১৪১টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ১১টি।
এছাড়া এ মাসে দেশে ৬টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। ময়মনসিংহে দীপু দাস হত্যা ইস্যুতে ১৮টি, খালেদা জিয়ার মৃত্যু ইস্যুতে ৯টি, আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানের বাদ ইস্যুতে ১০টি, জকসু নির্বাচন ইস্যুতে ৮টি, তাহরিমা জান্নাত সুরভী আটকের ইস্যুতে ৫টি এবং গ্যাস সংকট ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে৷ জানুয়ারি মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ২০৭টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ৩৪টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ২৩৯টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।